আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৪৯ এএম
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কখনোই আলোচনার বিষয় নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি ভূখণ্ডে হামলা চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, ওমানের রাজধানী মাসকাটে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আলোচনা ছিল পরোক্ষ। তবে সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে করমর্দনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তার ভাষায়, আলোচনা ছিল ‘ভালো সূচনা’, যদিও পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে এখনো ‘দীর্ঘ পথ বাকি’।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ওমানে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হওয়া আলোচনার পর আগামী সপ্তাহেই আরেক দফা আলোচনা হতে পারে।
তবে ইরানের রাজধানী তেহরানে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ আলোচনা নিয়ে আশাবাদ কম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী আল জাজিরাকে বলেন, আগের মতো এবারো আলোচনা ফলহীন হতে পারে, কারণ দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড়।
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ আল-শাইজি বলেন, নতুন কোনো চুক্তির সম্ভাবনা থাকলেও তিনি খুব আশাবাদী নন।
কাতারের রাজধানী দোহায় আল জাজিরা ফোরামে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রভাব ও চাপের মধ্যে রয়েছে এবং তারা মনে করছে, সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর ইরান দুর্বল অবস্থানে আছে। সে কারণে এখন ছাড় আদায় সহজ হতে পারে।
শুক্রবার আলোচনাকে ‘খুব ভালো’ বললেও ট্রাম্প শনিবার থেকে কার্যকর একটি নির্বাহী আদেশে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করতে বেশ কয়েকটি শিপিং কোম্পানি ও জাহাজের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের মোট বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশের বেশি হয়েছে চীনের সঙ্গে। ওই বছরে চীন থেকে ইরানের আমদানি ছিল ১৮ বিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানি ছিল ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণকে ইরানের ‘অপরিহার্য অধিকার’ উল্লেখ করে আরাঘচি বলেন, এটি অব্যাহত থাকবে। তবে তিনি জানান, সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আশ্বস্তকারী একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরান প্রস্তুত এবং পারমাণবিক ইস্যুর সমাধান কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনের বিষয়টি আলোচনায় আনতে চাইছে—যা ইসরায়েলও জোরালোভাবে দাবি করে আসছে। তবে ইরান বারবার জানিয়ে দিয়েছে, পারমাণবিক ইস্যুর বাইরে আলোচনার পরিধি বাড়ানো হবে না।
সামরিক চাপ ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা
গত বছর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ইসরায়েলের নজিরবিহীন বিমান হামলার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু হয়। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়।
গত মাসে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর ট্রাম্প হুমকি বাড়ান এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেন।
ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আলোচক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার শনিবার ওই রণতরী পরিদর্শন করেন। সামাজিক মাধ্যমে উইটকফ লেখেন, এই মোতায়েন ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ নীতির অংশ।
তবে আল-শাইজি মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে সামরিক চাপ বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। তার মতে, এতে ইরান প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের কৌশল নিয়েই ট্রাম্প প্রশাসন সমালোচনার মুখে পড়তে পারে।
এর মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, ওই বৈঠকে ইরান নিয়ে চলমান আলোচনা গুরুত্ব পাবে। নেতানিয়াহুর মতে, যেকোনো আলোচনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।
আরাঘচি বলেন, ওয়াশিংটন যদি হুমকি ও চাপের পথ থেকে সরে আসে, তাহলে আলোচনা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।
এমআর