আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪০ পিএম
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ অভিবাসীদের- বিশেষ করে বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে প্রায় দশ মাস ধরে। এবার বেআইনি ভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা চিহ্নিত করতে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশ দক্ষিণী রাজ্য মহারাষ্ট্রের সরকার।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-র একটি অনুষ্ঠানে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেভেন্দ্র ফডনবীশ বলেন, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি সরকারের হয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা চিহ্নিত করার কাজটি করছে। তবে কীভাবে এই এআই টুলটি ব্যবহার করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সম্ভবত একজন বাংলাদেশি বা একজন রোহিঙ্গা কীরকম দেখতে হন, তারা কীভাবে কথা বলেন, কী পোশাক পরেন, কোন অঞ্চলের বাসিন্দা- এরকম নানা তথ্য দেওয়া থাকবে এআই টুলটিকে। একই সঙ্গে তাদের বাংলায় কথা বলার ধরনও শেখানো হবে যন্ত্রকে। কিন্তু এত বিপুল পরিমানে তথ্য এআই টুলটিকে আগে থেকে 'ফিড' করিয়েও, তা দিয়ে বাস্তবে নির্ভুলভাবে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন এআই বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্ব নিয়ে আন্দোলন ও গবেষণা করা অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বসু প্রশ্ন তুলছেন, ‘কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিভিন্ন রাজ্যে তো ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন করা হয়েছে বা কাজ চলছে, সেখানে কতজন বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা পাওয়া গেল? সেই হিসাব আগে সরকারগুলো দিক’।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে: মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেভেন্দ্র ফডনবীশ বলেছেন, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুল তৈরি করা হচ্ছে, যেটা দিয়ে রাজ্যে বেআইনি বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা যাবে।
ফডনবীশকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই টুলটি আইআইটি বম্বের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করা হচ্ছে এবং এখন সেটি ৬০ শতাংশ নির্ভুল ভাবে কাজ করছে। চার মাসের মধ্যে সেটি এক শো শতাংশ নির্ভুলভাবে কাজ করবে আশা করা হচ্ছে।
এধরনের এআই টুল কীভাবে বানানো হয়, তার সম্যক ধারণা আছে, এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে কোনও কাজ করতে পারে না, যদি না তাকে আগে থেকেই কিছু শিখিয়ে রাখা হয়। আগে থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য যন্ত্রকে দিয়ে রাখতে হয়। সেই সব তথ্যের ওপরে ভিত্তি করেই এআই টুল অতি দ্রুত বিশ্লেষণ করে ফেলতে পারে।
কলকাতা ভিত্তিক ‘মিডিয়াস্কিল্স ল্যাব’ – এর প্রতিষ্ঠাতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ জয়দীপ দাশগুপ্ত বলছিলেন, ‘আমরা এটাকে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বলি, যেখানে ছবি, ভিডিও, মানচিত্র, অডিও, ইনফোগ্রাফিক্স, গবেষণা পত্র – যত তথ্য পাওয়া যায় – সব ফিড করে রাখা হয়। মহারাষ্ট্র যে টুলটি বানাচ্ছে, সেখানেও সম্ভবত এগুলো সবই ব্যবহার করা হবে।’
তার কথায়, ‘ধরুন যন্ত্রকে শিখিয়ে দেওয়া হবে যে একজন টিপিকাল বাংলাদেশি মুসলমান কেমন দেখতে হন – তিনি টুপি পরেন কি না, গোঁফ ছাড়া দাড়ি রাখেন কি না বা নারীদের ক্ষেত্রে বোরকা পড়েন কি না, কিভাবে কথা বলেন – হয়ত এইসব তথ্য শেখানো হবে। সেগুলোর ওপরে ভিত্তি করে যন্ত্র ঠিক করবে যে একজন ব্যক্তি বাংলাদেশি না রোহিঙ্গা না ভারতীয়। অর্থাৎ বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গাদের প্রোফাইল ঠিক করা হবে সম্ভবত।
‘কিন্তু এখানে সমস্যাটা হচ্ছে একই ধরণের দাড়ি রাখা বা টুপি পরা তো ভারতের বাংলাভাষী মুসলমানেরও অভ্যাস। আবার বহু হিন্দুও তো দাড়ি রাখেন, নানা ধরণের টুপি পরেন। তাহলে যন্ত্র একজন বাংলাদেশি মুসলমানের সঙ্গে একজন ভারতীয় মুসলমান বা ভারতীয় হিন্দুর ফারাকটা বুঝবে কী করে?’ প্রশ্ন রাখে দাশগুপ্ত।
তবে আইআইটি বম্বে ঠিক কীভাবে কাজ করছে, সেটা তিনি যেহেতু জানেন না, তাই এটা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয় যে এই নির্দিষ্ট টুলটিতে কী কী তথ্য ফিড করানো হচ্ছে।
এআই দিয়ে কি বাংলাদেশি চিহ্নিত করা সম্ভব?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এধরনের এআই টুল দিয়ে একশো শতাংশ নির্ভুল বিশ্লেষণ পাওয়া শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব। এর একটি কারণ হল, একজন ব্যক্তি বাংলাদেশি কী না, তা নিশ্চিত করতে যন্ত্রকে বিপুল পরিমাণ নির্ভুল তথ্য ভাণ্ডার দিতে হবে। আবার যন্ত্রকে তথ্য শেখানোর সময়ে যদি কোনো ভুল তথ্য দেওয়া হয় বা যারা যন্ত্রকে শেখাচ্ছেন, তারা যদি পক্ষপাতিত্ব করেন, তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্লেষণেও ভুল হবে।
জয়দীপ দাশগুপ্তের কথায়, ‘এআই-তে যে লিঙ্গ বৈষম্য করা হয়, তার অনেক প্রমাণ আছে। এর একটা কারণ হল, যারা যন্ত্রকে তথ্য দিচ্ছেন, তাদের একটা বড় অংশ পুরুষ। তাই তাদের শেখানো তথ্য দিয়ে এআই পুরুষদের পক্ষে পক্ষপাতমূলক বিশ্লেষণ করে থাকে।’
তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রের একটি বড় বহুজাতিক কোম্পানির প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট অরিজিৎ মুখার্জীর বলেন, ‘বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা চিহ্নিত করার জন্য যে তথ্য দেওয়া হবে যন্ত্রকে, সেখানে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করবে না তো?’
তিনি বলছিলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবকিছুই নির্ভর করে তাকে কীধরনের তথ্য দেওয়া হচ্ছে, যাকে আমরা ট্রেনিং ডেটা বলি, তার ওপরে। এধরনের একটা কাজ করতে গেলে লক্ষ লক্ষ ভয়েস স্যাম্পেল শেখাতে হবে যন্ত্রকে। সেগুলোর পৃথকীকরণ কারা করবে? সেখানে যে রাজনৈতিক পক্ষপাত হবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তাই ফলাফলও পক্ষপাতদুষ্ট হবে। এখানে একজন ব্যক্তি বাংলাদেশি না ভারতীয় বাংলাভাষী, সেটা নির্ধারণ করতে গেলে এক শতাংশ ভুল হলেও চলবে না। এটা নাগরিকত্বের প্রশ্ন।’
সীমান্তের দুই দিকে বাংলার একই উপভাষা
বাংলাদেশ আর ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে অনেক জায়গাতেই বাংলা ভাষায় কথা বলেন মানুষ। যেমন বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের ভাষায় ভারতের ত্রিপুরা বা আসামের বরাক উপত্যকার বহু মানুষ কথা বলেন। একই ভাবে রাজশাহীর দিকে যে ভাষায় কথা বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষাও এক।
আবার ভারতের মধ্যেও একেকটি অঞ্চলের বাঙালিদের মুখের ভাষা একেকরকম। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার মানুষ যেভাবে কথা বলেন, তা কলকাতার মানুষের কথার সঙ্গে আলাদা। আবার কলকাতার মানুষের মুখের ভাষার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলীয় শিলিগুড়ির মানুষের কথা বলার ধরণ আলাদা। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের মুখের ভাষার থেকে বেশি মিল ওড়িশার ভাষার।
বহুজাতিক সংস্থাটির প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট অরিজিৎ মুখার্জী বলছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার আর বাংলাদেশের লালমনিরহাটের মানুষের মুখের ভাষা কি আলাদা করা যায়? মানুষের কথা বলার ভাষা তো আর রাজনৈতিক সীমারেখা মানে না। তাই এআই দিয়ে বাংলাদেশিদের মুখের ভাষা আলাদাভাবে চেনা স্বপ্নই থেকে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের মুখের ভাষার একটা বিস্তৃত ক্ষেত্র আছে, এর কোনো নির্দিষ্ট আকার হয় না। আমরা কথা বলার সময়ে নানা ভাষা মিশিয়ে দিই, বিভিন্ন শব্দ অন্য ভাষায় বলি। কিন্তু এআই চায় একটা 'ক্লিন প্যাটার্ন'। সেটা কোনো যন্ত্রকে শেখানো বাস্তবে অসম্ভব। তখন এআই তখন আন্দাজের দিকে পা বাড়াবে, আর তার আন্দাজটা অর্ধেক সময়ে ভুল হবে’।
রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের আশংকা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছেন, বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা খুঁজতে গিয়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব করা হতে পারে, কারণ যেভাবে যন্ত্রকে তথ্য দেওয়া হবে – সেখানেই থাকবে ভুল তথ্য সরবরাহের সুযোগ।
তাদের কথায় বোঝা যাচ্ছে, যেভাবে একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করা হতে পারে, সেখানে যে ভারতীয় মুসলমান – এমনকি ভারতীয় হিন্দুও 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যেতে পারেন।
নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে যারা আন্দোলন করছেন কয়েক বছর ধরে, তারা প্রশ্ন তুলছেন, পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে তো ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে – তাতে কত বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা খুঁজে বার করা গেছে? এখন এআই টুল দিয়ে কি আদৌ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সঠিক ভাবে খুঁজে বার করা যাবে?
অর্থনীতিবিদ ও সদ্য কংগ্রেস দলে যোগ দেওয়া প্রসেনজিৎ বসু বলছেন, ‘এসআইআর-এর মতো নিবিড় প্রক্রিয়া চালিয়ে কতজন বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা চিহ্নিত করা গেল, সেই তথ্য দিক নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় সরকার আর বিজেপি। লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা ভারতে ঢুকে গেছে বলে যে মিথ্যাচারটা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেটার তো সত্যটা আমরা এখন টের পাচ্ছি। নানা রাজ্যে এই একই কথা বিজেপি বলে এসেছে। বারবার এদের মিথ্যাচারটা প্রমাণিত হচ্ছে। এখন আবার এআই টুল আনা হচ্ছে।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ অরিজিৎ মুখার্জীও বলছেন, ‘এআই টুলটি অবধারিতভাবে অসংখ্য ভারতীয়কে সন্দেহ করবে, তাদের মুখের ভাষাকে তাদের বিরুদ্ধেই প্রমাণ হিসাবে কাজে লাগাবে।’
গত প্রায় দশ মাসে বিবিসি একাধিক প্রতিবেদন করেছে যেখানে দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ আর আসামের বাংলাাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে আটক করে রাখা হয়েছে, অনেককে আইনসিদ্ধ পদ্ধতির বাইরে গিয়ে বাংলাদেশে পুশ-আউট করা হয়েছে।
যদিও যাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকে সত্যিই বেআইনিভাবে ভারতে বসবাস করছিলেন, কিন্তু একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, সত্যিকারের ভারতীয় বাংলাভাষী মুসলমানদেরও ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে বাংলাদেশে পুশ আউট করা হয়েছে। বিবিসি বাংলা
এমএইচআর