Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

ভারতে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব, এশিয়াজুড়ে বিমানবন্দরে কঠোর নজরদারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২২ পিএম

ভারতে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের পর থাইল্যান্ড, নেপাল এবং তাইওয়ানসহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের বিমানবন্দরগুলোতে কোভিড-ধাঁচের স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু করা হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত যাত্রীদের কঠোর স্ক্রিনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এসব যাত্রীর তাপমাত্রা স্ক্যান, স্বাস্থ্য পরিক্ষা এবং লক্ষণযুক্ত ভ্রমণকারীদের জন্য কোয়ারেন্টাইনের মতো ব্যবস্থা নিচ্ছে দেশগুলো। 

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, থাইল্যান্ডের তিনটি বিমানবন্দরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যেসব ফ্লাইট আসছে সেগুলোর যাত্রীদের বাড়তি স্ক্রিনিং করা হচ্ছে। এছাড়া নেপালের কাঠমান্ডু বিমানবন্দরেও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা ফ্লাইটের যাত্রীদের ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এরসঙ্গে ভারতের সঙ্গে স্থলবন্দরগুলোতেও কড়াকড়ি আরোপ করেছে তারা।

অন্যদিকে তাইওয়ান নিপাহকে একটি শীর্ষ-স্তরের নোটিফাইয়েবল রোগ হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে।

চলতি মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গে পাঁচজন স্বাস্থ্যকর্মী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এরপরই তাদের সংস্পর্শে আসা ১১০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

ভারতের জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও দেশটির দক্ষিণী রাজ্য কেরালায় নিপাহ ভাইরাসের প্রকোপ দেভা গেছে। কর্তৃপক্ষ সেখানে ১০০ থেকে ২০০ জনের তদন্ত করছে যারা নিপা ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন  বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কী এই নিপাহ ভাইরাস

নিপাহ ভাইরাস একটি জুনোটিক ভাইরাস। অর্থাৎ পশু থেকে মানুষের মধ্যে এই ভাইরাসটি এসেছে, যা মূলত সংক্রামিত শূকর এবং বাদুড় থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এটি Henipavirus জেনাসের অন্তর্গত একটি ভাইরাস, যা  মস্তিষ্ক বা শ্বসনতন্ত্রে প্রদাহ তৈরির মাধ্যমে মারাত্মক অসুস্থতার সৃষ্টি করে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বিশ্বে যে ১০টি রোগকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তার মধ্যে একটি নিপাহ ভাইরাস। কারণ প্রতিবছর নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষ প্রাণ হারায়। 

নিপাহ ভাইরাসের উৎপত্তি

১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায় সর্বপ্রথম নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে শূকরের খামারে কাজ করা চাষীদের মাধ্যমে প্রথম ছড়িয়েছিল ভাইরাসটি। আক্রান্ত শূকরের স্পর্শ, তাদের লালা এবং সংক্রমিত মাংসের মাধ্যমে এর বিস্তার ঘটে। পরবর্তীতে রোগটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় ১০০ মানুষ এ ভাইরাসে প্রাণ হারান। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে লাখ লাখ শূকর হত্যা করা হয়।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ২০০১ সালে মেহেরপুর জেলায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়। আর ২০০১ এবং ২০০৭ সালের দিকে পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছিল।

নিপাহ ভাইরাস কতটা জটিল? 

নিপাহ ভাইরাসকে বেশ জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা বলা যায়। কেননা এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা না পান, তবে তার মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে। নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ প্রকাশ পায় না। সংক্রমিত হওয়ার ৪-১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণগুলো দেখা দেয়। ৩-১৪ দিন এসব লক্ষণ স্থায়ী হয়। এই সময়ের মধ্যে যদি আক্রান্ত ব্যক্তির সঠিক চিকিৎসা করা হয়, তবে তার জীবন বাঁচানো যেতে পারে। অন্যথায় মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। 

কীভাবে নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়? 

মূলত, বাদুড় থেকে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ অন্যান্য পশুর দেহে ও মানব শরীরে ছড়ায়। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে শূকর থেকেও এটি সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার নিপাহ ভাইরাসে কোনো ব্যক্তি সংক্রমিত হলে তার সংস্পর্শে থাকা অন্যজনেরও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ কী? 

নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে বেশ কিছু উপসর্গ দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো—জ্বর, মাথাব্যথা, কাশি, গলা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বমি। আর গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তির মধ্যে দেখা যায়- তন্দ্রা বা বিভ্রান্তি, খিঁচুনি, কোমায় চলে যাওয়া এবং এনসেফালাইটিস। 

image

গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে, রোগী মৃত্যুর হার ৪০-৭৫ শতাংশ। এমনকি যারা নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর বেঁচে থাকে তাদেরও দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। অনেকসময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘ সময় অর্থাৎ মাস এমনকি বছর পর মারা যায়। তাই কারো মধ্যে এর লক্ষণসমূহ দেখা দিলে মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। আর নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কমপক্ষে ২১ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে এবং দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করে চিকিৎসা নিতে হবে। 

নিপাহ ভাইরাস কীভাবে নির্ণয় করা হয়? 

নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ সাধারণত কেবল লক্ষণ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। তবে এটি নিশ্চিত করতে RT-PCR পরীক্ষা করা হয়। যার মধ্যে শরীরের তরল পরীক্ষা করা হয়। ELISA পরীক্ষার মাধ্যমেও নিপাহ ভাইরাস নির্ণয় করা হয়।

নিপাহ ভাইরাসের চিকিৎসা

নিপাহ ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ সেভাবে পাওয়া যায়নি। ডব্লিউএইচও এর মতে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে যত্নই একমাত্র সমাধান। এজন্য আক্রান্ত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ বিশ্রাম নিতে এবং প্রচুর পানি ও তরল পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়, যাতে রোগী উপসর্গ থেকে মুক্তি পায়।

নিপাহ ভাইরাস থেকে বাঁচার উপায় 

নিপাহ ভাইরাস থেকে বাঁচতে কিছু বিষয় মেনে চলতে হবে। এগুলো হলো— খেজুরের কাঁচা রস বা তাড়ি না খাওয়া, খেজুরের কাঁচা রসে ডুবিয়ে পিঠা বা অন্য খাবার না খাওয়া, রস ভালোভাবে টগবগিয়ে ফুটিয়ে বা গুড় বানিয়ে খাওয়া, আধা খাওয়া ফল না খাওয়া, কেননা বাদুড়ের আধাখাওয়া ফল থেকে নিপাহ ছড়াতে পারে, যেকোনো ফল ধুয়ে খাওয়া এবং সবধরনের ধোয়া-মোছার কাজে সাবান ব্যবহার করা, কেননা সাবান ব্যবহারে নিপাহ ভাইরাস মারা যায়। 


সূত্র: বিবিসি, গালফ নিউজ


এমএইচআর