আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
গাজা যুদ্ধ বন্ধ ও উপত্যকাটির পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা ‘বোর্ড অব পিস’ জাতিসংঘের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
চলতি সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ইকোনোমিক ফোরামে নিজের নতুন 'বোর্ড অব পিস' উদ্বোধনের সময় তিনি বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে এমন এক অবস্থানে রয়েছি, যেখানে দশকের পর দশক ধরে চলা দুর্ভোগের অবসান ঘটানো, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমে থাকা ঘৃণা ও রক্তপাত থামানো এবং ওই অঞ্চলসহ সারা বিশ্বের জন্য একটি সুন্দর, স্থায়ী ও গৌরবময় শান্তি গড়ে তোলা সম্ভব।’
কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন রাজধানীর অনেক পর্যবেক্ষক ও কর্মকর্তার মতে, এটি ট্রাম্পের সেই উদ্যোগের আরও এক প্রমাণ—যার লক্ষ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী আন্তর্জাতিক কাঠামো ভেঙে ফেলা এবং তার জায়গায় নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা তার প্রভাবের অধীনে থাকবে।
একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ‘নতুন আন্তর্জাতিক অন্তর্বর্তীকালীন সংস্থা’ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের সাথে সাথে এটি নিয়ে উদ্বেগ ও বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে এটি কি সত্যিই জাতিসংঘের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা?
গত বছর গাজা যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টায় জন্ম নেওয়া এই ধারণা, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছিল, এখন আরও বৃহত্তর, মহাকায় এবং বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে এগোচ্ছে। আর সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ফাঁস হওয়া খসড়া সনদের তথ্যে দেখা যায়, ট্রাম্প পদ ছাড়ার পরও আজীবনের জন্য বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকবেন। ওই সনদ অনুযায়ী তার ক্ষমতা হবে ব্যাপক—কোনো দেশকে সদস্য হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হবে বা হবে না, উপ-সংস্থা বা সহায়ক সংস্থা গঠন বা বিলুপ্ত করা, এমনকি তিনি যখন ইচ্ছা পদত্যাগ করলে কিংবা অক্ষম হলে নিজ উত্তরসূরি নিয়োগের ক্ষমতাও থাকবে তার হাতে।
অন্য কোনো দেশ যদি স্থায়ী সদস্য হতে চায়, তার মূল্য ধরা হয়েছে চোখ কপালে তোলার মতো—১০০ কোটি ডলার।
এই নতুন বোমা ফাটানো তথ্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন সময়টি ইতিমধ্যেই ঘটনাবহুল। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ঘটেছে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে যুক্তরাষ্ট্রের কব্জায় নেওয়া, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি ও প্রস্তুতি, আর গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের ট্রাম্পের দাবি—যা ইউরোপজুড়ে এবং তার বাইরেও আলোড়ন তুলেছে।
দাভোসে বোর্ডের উদ্বোধনে আর্জেন্টিনা থেকে আজারবাইজান, সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র থেকে উপসাগরীয় রাজতন্ত্র পর্যন্ত ১৯টি দেশ উপস্থিত ছিল। আরও বহু দেশ এতে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে কানাডা, যুক্তরাজ্য, নরওয়েসহ অনেক দেশই এই পিস বোর্ডে যোগদানে ট্রাম্পের আহ্বানে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সাড়া দেয়নি।
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেন, ‘এটি এমন একটি চুক্তির বিষয়, যা আরও বিস্তৃত প্রশ্ন উত্থাপন করে, এবং শান্তি সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপস্থিতি নিয়ে আমাদেরও উদ্বেগ রয়েছে।’
ট্রাম্প দাবি করেছেন, রাশিয়া এই পিস বোর্ডে যুক্ত হতে আগ্রহী, যদিও মস্কো থেকে বার্তা এসেছে যে তারা এখনো অংশীদারদের সঙ্গে পরামর্শ করছে।
অন্যদিকে মুসলিমপ্রধান সাতটি দেশের একটি জোট—যার মধ্যে ছয়টি আরব দেশ, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া রয়েছে—স্পষ্ট করেছে, গাজায় ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তির জন্য তারা এতে যুক্ত হচ্ছে। তবে বোর্ডের সনদের ফাঁস হওয়া তথ্যে গাজার কোনো উল্লেখ নেই।
অনেক বিশ্বনেতারা আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্পের এই নতুন সংগঠনে যোগ না দিলে তাদের চরম মূল্য দিতে হতে পারে।
ইতোমধ্যেই ‘বোর্ড অব পিস’- এ যোগদানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করায় ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেইনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমি তার (ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ) ওয়াইন আর শ্যাম্পেইনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক বসাবো। তখন তিনি (বোর্ড অব পিসে) যোগ দেবেন। তবে না দিলেও আমার কিছু যায় আসে না।’
এরপর স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলব উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন— ‘ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বিপজ্জনকভাবে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করছে।’
তবে এই উদ্বেগের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘এই বোর্ড পুরোপুরি গঠিত হয়ে গেলে, আমরা প্রায় যা ইচ্ছা তাই করতে পারব এবং জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় করেই তা করব।’
এই মন্তব্যের একদিন আগে ফক্স টিভির এক সাংবাদিক ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তার বোর্ড কি জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করবে। তিনি জবাব দেন, ‘হয়তো করবে। জাতিসংঘ খুব একটা সহায়ক হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের সম্ভাবনার আমি বড় ভক্ত, কিন্তু সংস্থাটি কখনোই সেই সম্ভাবনার যথাযথ ব্যবহার করতে পারেনি। আমি যে যুদ্ধগুলোর মীমাংসা করেছি, সেগুলো জাতিসংঘেরই মিটিয়ে ফেলা উচিত ছিল।’
মূলত, এই পিস অব বোর্ড গঠনের বিষয়টি ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনার অংশ, যা গত বছরের অক্টোবরে প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদদের নিয়ে গঠিত সংস্থা গাজা পরিচালনা করবে। আর এই বোর্ড একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই শাসনব্যবস্থা তদারকি করবে।
তবে কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফ্টের খালেদ এলগিন্ডি রয়টার্সকে বলেছেন, ‘মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন ধারণা আসছে যে তারা শান্তি বোর্ডের পরিধি আরো বিস্তৃত করতে এবং এমনকি বর্তমান জাতিসংঘ ব্যবস্থা প্রতিস্থাপনের কথাও বলতে চায়। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে গাজা দিয়ে শুরু হতে পারে কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এটি শেষ কাজ নয়।’
ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই জাতিসংঘে মার্কিন তহবিল কমিয়ে দিচ্ছে। গত ৭ জানুয়ারি, ট্রাম্প একটি স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন যেখানে ‘মার্কিন জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে’ এমন ৩১টি জাতিসংঘ সত্তা থেকে ক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন এবং জাতিসংঘ ডেমোক্রেসি ফান্ড।
জানা যাচ্ছে, ট্রাম্পের এই বোর্ডে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে ইতিমধ্যেই কয়েক ডজন বিশ্ব নেতাকে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন- অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ, ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, সাইপ্রিয়ট রাষ্ট্রপতি নিকোস ক্রিস্টোডুলিডেস, মিশরীয় রাষ্ট্রপতি আবদেল ফাত্তাহ এল-সিসি, ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডের লেইন, গ্রীক প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোটাকিস, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, জর্ডানের প্রধানমন্ত্রী জাফর হাসান, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি, পোলিশ প্রেসিডেন্ট ক্যারল নওরোকি, রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন, তুর্কি রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, বোর্ডে যোগদানের বাধ্যবাধকতা নেই - তবে যারা কেবল তিন বছরের সদস্যপদ থাকার পরিবর্তে স্থায়ী সদস্য হতে চান, তাদেরকে এক বিলিয়ন ডলার ফি দিতে হবে।
সূত্র: বিবিসি
এমএইচআর