আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩৬ এএম
কয়েকদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেছে সিরিয়া সরকার ও কুর্দি-নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)। চুক্তি অনুযায়ী, ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিমাঞ্চল থেকে এসডিএফ বাহিনী প্রত্যাহার এবং তাদের যোদ্ধাদের সিরীয় সেনাবাহিনীতে একীভূত করা হবে।
ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী কৌশলগত এলাকা ও তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিরীয় সরকারি বাহিনী ও এসডিএফের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের মধ্যে রোববার চুক্তি হয়েছে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, এসডিএফ কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে সামরিক, নিরাপত্তা ও বেসামরিক উচ্চপদে নিয়োগের জন্য নেতৃত্বের একটি তালিকা প্রস্তাব করবে। এতে করে জাতীয় অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হবে। একইসঙ্গে সীমান্ত ক্রসিং, তেল ও গ্যাসক্ষেত্রসহ সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে সিরিয়া সরকার। এর আগে, গেল মার্চে এমন একটি চুক্তি হলেও তা কার্যকর হয়নি।
দামেস্কে দেওয়া বক্তব্যে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বলেন, চুক্তির ফলে আল-হাসাকা, দেইর আজ-জোর ও রাক্কা প্রদেশের প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবেম যেগুলো এত দিন এসডিএফের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
তিনি বলেন, চুক্তির বাস্তবায়নের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট আরব গোত্রগুলোকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, আইএসআইএল (আইএস) সংশ্লিষ্ট বন্দি ও শিবিরগুলোর দায়িত্বে থাকা এসডিএফ প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে। এর ফলে এসব বন্দিশিবিরের পূর্ণ আইনি ও নিরাপত্তা দায়িত্ব সিরীয় সরকারের হাতে চলে যাবে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের সামরিক, নিরাপত্তা ও বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের জন্য এসডিএফ একটি প্রস্তাবিত তালিকা দেবে, যাতে জাতীয় অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাকের সঙ্গে দামেস্কে বৈঠকের পর এই ঘোষণা দেন আল-শারা। বৈঠকে এসডিএফ প্রধান মাজলুম আবদির উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও আবহাওয়ার কারণে তার সফর এক দিন পিছিয়ে যায়। কুর্দি সংবাদমাধ্যম রুদাও জানিয়েছে, সোমবার তিনি দামেস্ক সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট আল-শারার সঙ্গে বৈঠক করবেন।
মার্কিন বিশেষ দূত টম ব্যারাক যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক মাধ্যম এক্সে (আগের টুইটার) লেখেন, এটি একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মোড়’, যেখানে বিভাজনের পরিবর্তে অংশীদারিত্বের পথে এগোনো হয়েছে।
তিনি বলেন, কুর্দিরা সিরিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অংশীদার এসডিএফকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হতে দেখার প্রত্যাশা রয়েছে ওয়াশিংটনের।
এদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান ফোনে আল-শারার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের বিবৃতিতে বলা হয়, সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে সন্ত্রাসবাদ পুরোপুরি নির্মূল করা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি। তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে এসডিএফকে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)-র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করে আসছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতিকে দামেস্ক ও তাদের মিত্র তুরস্কের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, এসডিএফ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃত্ব ধাপে ধাপে সরকারের হাতে হস্তান্তর করা হবে। পাশাপাশি সব সীমান্ত পারাপার পয়েন্ট এবং তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণও নেবে সিরীয় সরকার।
এর আগে মার্চ মাসে এসডিএফকে সিরীয় সেনাবাহিনীতে একীভূত করার একটি সমঝোতা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে, যা চলতি মাসে আরো তীব্র হয়।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, শনিবার সিরীয় সেনাবাহিনী এসডিএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখে রাক্কার পশ্চিমের তাবকা শহর ও তাবকা বাঁধ, পাশাপাশি দেইর আজ-জোরের ওমর তেলক্ষেত্র ও কনোকো গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক জামাল মানসুর বলেন, রাজনৈতিকভাবে ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ায় এসডিএফ দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। তার মতে, এসডিএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আরব গোত্রগুলোর মধ্যে অসন্তোষ এবং পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক বিনিয়োগের অভাবও সরকারের দ্রুত অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রেখেছে।
চুক্তিতে আরো বলা হয়েছে, সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এসডিএফ সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে সব অ-সিরীয় পিকেকে সদস্য ও নেতাদের সরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।
এমআর