images

আন্তর্জাতিক

ইরানের অর্থনীতি কেন ভেঙে পড়েছে?

১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম

আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসের গভীর এবং দীর্ঘতম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইরানের অর্থনীতি। গত ডিসেম্বরে তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারের দোকানদাররা অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে দোকান বন্ধ করার চার সপ্তাহ পর এখন অনেকটাই স্তব্ধ ইরান। দেশজুড়ে চলমান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে সরকারবিরোধী আন্দোলন আপাতত শান্ত হয়ে এসেছে, যদিও এর পেছনের ক্ষোভ এখনো কমেনি।

গ্র্যান্ড বাজারের দোকানিদের বিক্ষোভের পর লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসলেও বহু বিক্ষোভকারী নিহত ও আটক হওয়ার পর এখন তারা বাড়িতে অবস্থান করছেন। ইরান সরকার এখনো বিক্ষোভে নিহতদের কোনো আনুষ্ঠানিক সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) চলতি সপ্তাহে নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৬১৫ বলে দাবি করেছে। সরকার এই হিসাবকে অতিরঞ্জিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

image

এদিকে বিক্ষোভ দমনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনাও বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ সপ্তাহে হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকলে পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দেন। তবে গত বুধবার রাতে তিনি জানান, তেহরান থেকে আশ্বাস পাওয়ার পর তিনি অবস্থান নরম করেছেন; যেখানে বলা হয়েছে, আর হত্যাকাণ্ড বা আটক বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না।

যদিও বিক্ষোভকারীদের আপাতত চুপ করে দেওয়া হয়েছে, তবুও তাদের উদ্বেগের সমাধান এখনও অনেক দূরে। এছাড়াও মার্কিন হামলার হুমকি এখনও রয়েছে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের শেষ দিকে যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার প্রতিবাদে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল, তা আরও খারাপ হয়েছে।

অর্থনীতি নিয়ে কেন বিক্ষোভ শুরু হয়েছে?

লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এমেরিটাস অধ্যাপক হাসান হাকিমিয়ান আল জাজিরাকে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক অস্থিরতার মূল কারণ গভীর অর্থনৈতিক সংকট। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞ ও কয়েক দশক ধরে চলমান দুর্নীতি এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনায় এই সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তোলে।’

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান গুরুতর পরিবেশগত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘তীব্র পানির সংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ভয়াবহ বায়ুদূষণ- যা পরিস্থিতিকে একটি নিখুঁত অর্থনৈতিক ঝড়ে পরিণত করেছে’। 

অন্যদিকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর রিয়াল ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়, প্রথমে প্রতিবাদের সূত্রপাত করেছিল- এখনো তা স্থিতিশীল হয়নি। এছাড়াও, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ‘ন্যাশনাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক’ কার্যত বন্ধ থাকায় দেশটির ব্যাংকগুলোর এটিএম, ফ্লাইট পরিষেবা ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাভাদ সালেহি-ইসফাহানি বলেন, বিক্ষোভের কারণে প্রায় এক মাস ধরে সবকিছু বন্ধ থাকায় ইরানের অর্থনীতি কার্যত ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। এতে দেশটির জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে, যার আর্থিক পরিমাণ ২০ থেকে ৯০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।

নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে যেভাবে প্রভাব ফেলেছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও নীতিগত পরিবর্তনে ইরানের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে সবচেয়ে মারাত্বক পরিস্থিতির সম্মুখীন। এর একটি প্রধান কারণ হলো ইরান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিকে কন্দ্রে করে ২০০৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। আর গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ দেশটির অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলে।

আলজাজিরার তথ্য অনুসারে ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের মাধ্যমে দেশটির শেষ শাহ বা রাজা মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে উৎখাত করা হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে তেহরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ এবং ইরানের ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করে ওয়াশিংটন।

পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ইরানের তেল ও গ্যাসে বিনিয়োগ এবং যেকোনো ব্যবসা করতে নিষেধ করে নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এক বছর পর, মার্কিন কংগ্রেস একটি আইন পাস করে যার মাধ্যমে ইরানের জ্বালানি খাতে বছরে ২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগকারী বিদেশী কোম্পানিগুলো ইরান তেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

অন্যদিকে ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের পারমাণবিক-শক্তি-সম্পর্কিত উপকরণ এবং প্রযুক্তির বাণিজ্যের ওপর নিজস্ব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং এর সাথে সম্পর্কিত কার্যকলাপে জড়িত ব্যক্তি ও কোম্পানির সম্পদ জব্দ করে। পরবর্তী বছরগুলোতে জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞাগুলো আরও কঠোর করে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও তা অনুসরণ করে।

এই নিষেধাজ্ঞাগুলো এড়াতে ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া এবং যুক্তরাজ্যের সাথে একটি পারমাণবিক চুক্তি - জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিওপিএ) স্বাক্ষর করে ইরান। এর অধীনে, ১৫ বছরের জন্য কোনও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং গবেষণা থেকে বিরত থাকতে সম্মত হয় দেশটি। 

কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার প্রথম মেয়াদে ওই পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং ইরানের ওপর সমস্ত নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করেন। এছাড়াও ২০১৯ সালে, ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস বাহিনীকে (আইআরজিসি) একটি বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে মনোনীত করে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে পেট্রোকেমিক্যাল, ধাতু (ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, তামা) এবং ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

৩ জানুয়ারী, ২০২০ তারিখে, ইরাকের বাগদাদে ড্রোন হামলায় আইআরজিসির অভিজাত কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করার পর, আমেরিকা ইরানের উপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

সর্বশেষ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরানের ওপর ১০ বছর আগে তুলে নেওয়া নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করে। 

image

ইরানের সাধারণ মানুষের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব 

গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের আগেও অনেক অর্থনীতিবিদ ইরানের অর্থনীতিকে ‘স্থবিরতার’ যুগে আটকে থাকা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, কারণ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল দ্বারা প্রতি বছর মাত্র ০.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অনুমান করা হয়েছিল। অর্থনীতিবিদরা সাধারণত ২ থেকে ৩ শতাংশ বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকে আদর্শ বলে মনে করেন।

দেশটির সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত আট বছরে ইরানিদের ক্রয় ক্ষমতা- দামের তুলনায় তাদের ব্যয় করা অর্থের মূল্য - ৯০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। আর মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের পতনের ফলে খাদ্যের দাম গত বছরের তুলনায় গড়ে ৭২ শতাংশ বেড়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের দাম ছিল প্রায় ১৩ লাখ ৬০ হাজার রিয়াল, যা সর্বকালের সর্বনিম্ন। আর জানুয়ারির শুরুতে যখন বিক্ষোভ পুরোদমে চলছিল, তখন ইরানি রিয়াল আরও কমে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বিনিময় হার ১৪ লাখ রিয়াল ছাড়িয়ে যায়।  রিয়ালের এই ধারাবাহিক পতন ইরানিদের ক্রয়ক্ষমতা প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছে। 


সূত্র: আলজাজিরা

এমএইচআর