images

আন্তর্জাতিক

ইরানে হামলা চালাতে যেসব পদক্ষেপ বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম

ইরানের ওপর চালানো যেতে পারে এমন বেশ কয়েকটি সামরিক ও গোয়েন্দা পদক্ষেপের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুইজন কর্মকর্তার বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, সম্ভাব্য মার্কিন পদক্ষেপের ক্ষেত্রে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এখনো একটি বিকল্প হিসেবে রয়েছে। তবে পেন্টাগন কর্মকর্তারা সাইবার অভিযান এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির জন্য প্রচারণার বিষয়েও প্রস্তাব দিয়েছেন।

সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এরই মধ্যে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, গত তিন সপ্তাহে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ৬০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী, তবে তারা ‘যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত’ অবস্থায়ও রয়েছে।

মার্কিন সূত্রগুলো বলছে, মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল ইরান নিয়ে বিকল্পগুলো আলোচনা করতে বৈঠক করবে। তবে প্রেসিডেন্ট নিজে বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, আরও বিক্ষোভকারী নিহত হলে তার সেনাবাহিনী খুব শক্তিশালী বিকল্প বিবেচনা করছে। তার দাবি, ইরানি নেতারা তাকে ‘আলোচনার জন্য ফোন করেছেন’, তবে তিনি যোগ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বৈঠকের আগেই পদক্ষেপ নিতে হতে পারে’।

ইরানি মুদ্রার পতন এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ এখন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনির জন্য বৈধতার সংকটে পরিণত হয়েছে।

সোমবার হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ইরানের এক কর্মকর্তা ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন। তিনি যোগ করেন, তেহরানের প্রকাশ্য অবস্থান ‘প্রশাসন যে বার্তা গোপনে পাচ্ছে তার থেকে বেশ আলাদা’।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন মনে করলে সামরিক বিকল্প ব্যবহার করতে ভয় পান না।

দুই সূত্র, যারা জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনায় সিবিএসের সঙ্গে কথা বলার জন্য নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন, তারা বলেছেন যে ইরানে যেকোনো মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সম্ভবত বিমান শক্তি ব্যবহার করা হবে। তবে পরিকল্পনাকারীরা ইরানের নেতৃত্বের কাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করার বিকল্পগুলোও বিবেচনা করছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে অবস্থানরত তাদের নাগরিকদের দেশ ছাড়তে বা এমন একটি পরিকল্পনা রাখতে আহ্বান জানিয়েছে, যাতে মার্কিন সরকারের সহায়তা প্রয়োজন না হয়।

খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘প্রতারণা’ এবং ‘বিশ্বাসঘাতক ভাড়াটে সৈন্যদের’ ওপর নির্ভর করার অভিযোগ করেছেন, একইসঙ্গে সোমবার ইরানে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সরকারপন্থি সমাবেশের প্রশংসা করেছেন।

তিনি বলেছেন, ‘ইরানি একটি শক্তিশালী জাতি, তারা শত্রুদের বিষয়ে অবগত ও সচেতন এবং প্রতিটি দৃশ্যপটেই তারা উপস্থিত থাকে’।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সরকারপন্থি বিক্ষোভের আহ্বানের পর কয়েকটি শহরে বিপুল জনসমাগম হয়েছে। দেশের ভেতরে মানুষকে এসব সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য পাঠানো টেক্সট বার্তা দেখেছে, একইসঙ্গে তাদের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ না নেওয়ার সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে সোমবার ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশাল প্ল্যাটফর্মে বলেছেন, তিনি তেহরানের সঙ্গে ‘ব্যবসা করছে’ এমন দেশগুলোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘এই আদেশ চূড়ান্ত এবং অপরিবর্তনীয়’।

ইতোমধ্যেই কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরানে মুদ্রার দরপতন ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে খাদ্যের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। খাদ্য ইরানের আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে এবং শুল্কজনিত অতিরিক্ত বিধিনিষেধ ঘাটতি ও ব্যয় আরও বাড়াতে পারে।

হোয়াইট হাউস শুল্ক নিয়ে অতিরিক্ত কোনো তথ্য দেয়নি। ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন, এরপর রয়েছে ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক ও ভারত। এই পদক্ষেপ তেহরানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কারণ ইরানি সরকার সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোরতা বাড়াচ্ছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভি ট্রাম্পকে আহ্বান জানিয়েছেন ‘যত দ্রুত সম্ভব’ হস্তক্ষেপ করতে, যাতে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর সংখ্যা সীমিত রাখা যায়।

সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাহলভি বলেছেন, বর্তমান ইরানি সরকার ‘বিশ্বকে আবারও আলোচনায় প্রস্তুত বলে বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করছে’।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রসংশা করে তিনি আরও বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) এমন একজন ব্যক্তি যিনি যা বলেন তা মানেন ও যা মানেন তা বলেন এবং যিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝেন। আমার মনে হয় প্রেসিডেন্টকে খুব শিগগিরই একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে’।

নরওয়ে-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআরএনজিও)-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানে অন্তত ৬৪৮ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৮ বছরের নিচে নয়জন রয়েছে।

তবে ইরানের ভেতরের সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইরানের ভেতর থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতে পারছে না। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে চলা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।


সূত্র: বিবিসি


এমএইচআর