images

আন্তর্জাতিক

বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করল ইরানি সেনাবাহিনী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম

অর্থনৈতিক মন্দার প্রতিবাদে ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়া গণ-আন্দোলনের মুখোমুখি ইরান। রাজধানী তেহরানসহ বেশ কয়েকটি শহরের দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত ৬০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া হওয়া গেছে। এই পরিস্থিতি দেশের কৌশলগত অবকাঠামো এবং জনসাধারণের সম্পত্তি রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছে ইরানি সেনাবাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। 

শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিবৃতেতে আইআরজিসি বলেছে, ‘গত দু’রাত ধরে সন্ত্রাসীরা সামরিক ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর ঘাঁটিগুলো দখলের চেষ্টা করছে, বেশ কয়েকজন নাগরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা-কর্মীকে হত্যা করেছে এবং সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করছে। ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।’

এতে আরও বলা হয়, ‘১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির নিরাপত্তার স্বার্থে আইআরজিসি ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করছে। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ক্ষতির চেষ্টা করলেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

পৃথক এক বিবৃতিতে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং শত্রু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে দেশের জননিরাপত্তাকে দুর্বল করার চেষ্টার অভিযোগ করেছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘সর্বোচ্চ কমান্ডার-ইন-চিফের নেতৃত্বে বাহিনী, অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীর সাথে, এই অঞ্চলে শত্রুদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি, জাতীয় স্বার্থ, দেশের কৌশলগত অবকাঠামো এবং জনসাধারণের সম্পত্তি দৃঢ়ভাবে রক্ষা এবং সুরক্ষিত করবে।’

এছাড়াও ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ শনিবার সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়াদের ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে বিবেচিত হবে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১০০ জন ‘সশস্ত্র দাঙ্গাবাজ’কে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধেও ‘আল্লাহর শত্রু’ বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। 

এরআগে ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভের বিষয়ে প্রথম ভাষণে শুক্রবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘ভাঙচুরকারী’ এবং ‘নাশকতাকারী’ বলে অভিহিত করেছেন।

এদিকে এই বিবৃতিগুলো এমন সময় এলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নেতাদের প্রতি নতুন সতর্কবার্তা এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের জনগণের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন ঘোষণা করেছেন।

শুক্রবার হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান (সরকার) বড় বিপদে আছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে বিক্ষোভকারীরা অনেক শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, এমনটি সম্ভব হতে পারে যা কয়েক সপ্তাহ আগে কেউ চিন্তাও করেনি। আমরা খুবই সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছি, যদি আগের মতো তারা বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা শুরু করে, আমরা এরসঙ্গে জড়িত হব। এর অর্থ এই নয় যে, আমাদের সেনারা ইরানে যাবে। কিন্তু এর অর্থ হলো তাদের সেখানে খুবই কঠোর… কঠোর হামলা চালাব, যেখানে হামলা চালালে তারা সবচেয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হবে। এমনটি হোক আমরা চাই না।’

প্রসঙ্গত, বছরের পর বছর ধরে নজিরবিহীন মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে বিক্ষোভের শুরুতেই ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী বল প্রয়োগ করে এটি দমনের চেষ্টা করেছে।

দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন এখন পর্যন্ত দেশটির ৩১টি প্রদেশের ১০০টিরও বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরান ছাড়াও দেশটির কেন্দ্রীয় শহর ইসফাহান, উত্তরের শহর বাবোলে এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাবরিজেও বিক্ষোভ করেছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর দেজফুলেও বিক্ষোভকারীদের বিশাল ভিড় দেখা গেছে। তারা রাষ্ট্রীয় টিভিসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ভাঙচুরের পাশাপাশি একটি মসজিদেও আগুন দিয়েছে। এসময় বিক্ষোভকারীদের হাতে দেখা গেছে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব পূর্ববর্তী সময়ের পতাকা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংবাদ সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভ ৪৮ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে পাঁচজন শিশু এবং আটজন নিরাপত্তা কর্মী রয়েছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে আরও দুই হাজার ২৭৭ জন বিক্ষোভকারীকে। আর নয়জন শিশুসহ কমপক্ষে ৫১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে নরওয়ে-ভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস বা আইএইচআর।

যদিও দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় বন্ধ থাকা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ না থাকায় প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে।

সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি

এমএইচআর