images

আন্তর্জাতিক

‘আই লাভ মুহাম্মদ’ ব্যানার ঘিরে ভারতে মুসলিমদের হয়রানি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০১:৫৪ পিএম

ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুরে ঈদে মিলাদ-উন-নবী উপলক্ষে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা ব্যানার নিয়ে শোভাযাত্রা বের করাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এক পুলিশি মামলার জেরে দেশজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, অন্যদিকে প্রশাসনের দাবি, ব্যানারের ভাষা নয়, সমস্যা হয়েছে অনুমতি ছাড়াই জনসমাবেশ এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরির কারণে।

বিতর্ক শুরু হয় কানপুরে ৪ সেপ্টেম্বর, যখন স্থানীয় মুসলিমরা চিরাচরিত রুট ছেড়ে অন্য একটি জায়গায় প্যান্ডেল টানিয়ে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ ব্যানার লাগান। এ নিয়ে এলাকাবাসীর একাংশ আপত্তি তোলে। পুলিশ জানায়, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে পরে ব্যানারটি মূল রুটে স্থানান্তর করা হয়। তবে ১০ সেপ্টেম্বর, শোভাযাত্রার পাঁচদিন পর পুলিশ নিজ উদ্যোগে মামলা দায়ের করে। এফআইআরে বলা হয়, মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ ধর্মীয় শোভাযাত্রায় নতুন রীতি চালু করার চেষ্টা করেছে এবং এতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর সম্ভাবনা ছিল।

পুলিশ দাবি করেছে, ব্যানারে লেখা নিয়ে নয়, বরং অনুমতি ছাড়াই প্যান্ডেল টানানো, নির্ধারিত রুট পরিবর্তন এবং শোভাযাত্রার সময় অপর পক্ষের ধর্মীয় পোস্টার ছেঁড়া— এসব অভিযোগেই মামলা হয়েছে। যদিও মুসলিম নেতারা বলছেন, এটি শুধুই ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশ, যার জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

এই ঘটনার প্রতিবাদে কানপুর ছাড়াও উত্তরপ্রদেশের উন্নাও, লক্ষ্ণৌ, বহরাইচ এবং উত্তরাখণ্ড, গুজরাট ও মহারাষ্ট্রের একাধিক শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

উন্নাওয়ে মুসলিমরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিল করেন। সেখানে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয় এবং পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়। গঙ্গাঘাট থানা এলাকায় এই ঘটনার সময় নারী ও শিশুরাও ব্যানার হাতে উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ জানায়, ১৪৪ ধারা জারি থাকায় অনুমতি ছাড়া কোনো জমায়েত অবৈধ।

কাশীপুরে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ ব্যানার নিয়ে একটি বড় মিছিল বের হলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। অভিযোগ, মিছিলকারীরা পুলিশের গাড়িতে হামলা চালায়। এতে ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়, আরও ১০ জনকে আটক করা হয়। পুলিশ বলছে, পুরো বিষয়টির নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

গুজরাটের গোধরায় একজন মুসলিম যুবক সামাজিক মাধ্যমে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ ব্যানার সংক্রান্ত পোস্ট করার পর পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ এনে ভিডিও প্রকাশ করলে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় ৮৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা ও ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

মুম্বাইয়ের ভায়খলা এলাকাতেও ২১ সেপ্টেম্বর মুসলিমরা ব্যানার নিয়ে মিছিল করেন। এখানেও অনুমতি ছাড়াই জমায়েত করার অভিযোগে একজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়, পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এই বিতর্ক ঘিরে রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়াও আসছে। এআইএমআইএম নেতা ও সংসদ সদস্য আসাদুদ্দিন ওয়েইসি পুলিশকে ট্যাগ করে বলেন, আই লাভ মুহাম্মদ বলা কোনো অপরাধ নয়। যদি এটা অপরাধ হয়, আমাকেও গ্রেফতার করুন।

সমাজবাদী পার্টির নেত্রী সুমাইয়া রানা লক্ষ্ণৌতে বিধানসভার সামনে ব্যানার হাতে নিয়ে বিক্ষোভ করেন। তার দাবি, নারী ও শিশুরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করলেও পুলিশ তাদের থামিয়ে দেয় এবং কয়েকজনকে কিছু সময় হেফাজতে রাখে।

আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা ফৈজুল হাসান বলেন, কোনো স্লোগান দিইনি, আইনও ভাঙিনি, তবুও আমাদের নামে মামলা হয়েছে। এটা আমাদের ধর্মীয় অনুভূতির ওপর সরাসরি আঘাত। তিনি এই মামলা বাতিলের জন্য এলাহাবাদ হাইকোর্টে আবেদন করেছেন।

এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ইমরান প্রতাপগড়ীও। তিনি বলেন, ভারতের ৩০ কোটি মুসলমানই নবী মুহাম্মদকে ভালোবাসেন। তাহলে কি তাদের সবাইকে মামলা দিয়ে জেলে দেওয়া হবে? তবে তিনি মুসলিম যুবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আইন মেনে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করাই ভালো।

বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর কাউকে আঘাত করা হয়নি, বরং যারা অনুমতি ছাড়াই আইন লঙ্ঘন করছে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। উত্তর প্রদেশ বিজেপির মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠি বলেন, যেখানে পোস্টার বা ব্যানার টানাতে হবে, তারও নিয়ম আছে। আইন ভাঙলে ব্যবস্থা হবে, এটাই স্বাভাবিক।

উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। রমজানে ঘরের ভেতর নামাজ, বাড়ির ছাদে নামাজ, ঈদের জামাতের ছবি পোস্ট করা— সব কিছু নিয়েই মুসলমানদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। এবার নবীকে ভালোবাসার ব্যানার নিয়েও গ্রেফতার, যা সংখ্যালঘুদের ক্রমাগত কোণঠাসা করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে পুলিশ ও প্রশাসন বলছে, কেউ যদি আইন ভাঙে বা উত্তেজনা ছড়ায়, তখন ধর্ম নয়, আইনই মুখ্য হয়। সূত্র: বিবিসি

এইউ