Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

পানি নিয়ে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের ভবিষ্যৎ কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

৩০ আগস্ট ২০২৫, ০৯:৪৭ পিএম

তিন নদী, দুই দেশ আর দীর্ঘদিনের সংঘাত— ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের দিকে এক ঝলক তাকালে ঠিক এই দৃশ্যই দেখা যায়। সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব এই তিন নদী গত কয়েক মাস ধরেই দীর্ঘসূত্রী সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। 

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরের কোর্ট অব আরবিট্রেশন রায় দিয়েছে, ভারতের উচিত সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব নদীর পানি বইতে দেওয়া। তবে এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তীব্র আপত্তি জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

মূলত, গত ২২ এপ্রিল ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলার পরেই পাকিস্তানকে দায়ী করে সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি স্থগিত করে দেওয়া। সিন্ধু এবং তার উপনদীগুলোর পানি বণ্টনের জন্য বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

ভারত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদকে মদত দেওয়া বন্ধ না করা পর্যন্ত এই চুক্তি স্থগিত থাকবে। মে মাসে ভারত-পাক সংঘাত বন্ধ হলেও চুক্তি কিন্তু স্থগিতই রয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কথায়, ‘রক্ত ও একসঙ্গে বইতে পারে না।’

সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত করার বিষয়টি এখনও খাতায়-কলমে। পাকিস্তানে জল আটকানোর বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ যে ভারত নেয়নি, সেটি একাধিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও প্রকাশ পেয়েছে। ইসলামাবাদও অবশ্য জানিয়েছিল, পানি বন্ধ হলে ধরেই নেওয়া হবে এটা যুদ্ধের উস্কানি।

আদালতের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন ভারতের

এদিকে, পাকিস্তানের জন্য ভারতের পশ্চিম দিকের নদীগুলোর পানি প্রবাহিত রাখতে হবে বলে সম্প্রতি রায় দিয়েছে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে অবস্থিত পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন। ভারতের বিরুদ্ধে এই আদালতে অভিযোগ করেছিল পাকিস্তান।

ভারতের পাল্টা দাবি, এই রায় অপ্রাসঙ্গিক। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের কথায়, ‘ভারত কখনো পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশনের বৈধতা বা প্রাসঙ্গিকতাকে স্বীকার করেনি। ফলে এই রায় সম্পূর্ণ ভাবে এখতিয়ার বহির্ভূত। ভারতের পানি ব্যবহারের অধিকারে এর কোনো প্রভাব নেই।’

তিনি আরও জানান, আদালতের এই রায় নিয়ে পাকিস্তানের বিভ্রান্তিকর দাবি ভারত মেনে নেবে না।

পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, ভারত পাকিস্তানের মধ্যে সব রকম কূটনীতিক যোগাযোগ এখন বন্ধ। ফলে দ্রুত সমাধান এখনও বহু দূর।

ভারতের মনোহর পরিক্কর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ উত্তম কুমার সিনহা জানান, পানি নিয়ে এই সংকট অতিদ্রুত পরিণত হতে পারে এশিয়ার অন্যতম রাজনৈতিক সংঘাতে। 

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান আদালতের এই রায়টি দেখিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে শুরু করে অরগানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন পর্যন্ত নানা সংস্থার সামনে তাদের এই জল নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি তুলে ধরবে। ভারত পাল্টা দাবি করবে, তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর এই রায়ের প্রভাব নেই। পশ্চিমাংশের নদীগুলোর ওপর তাদের জলবিদ্যুৎ ও সেচ পরিকাঠামো চালু করার পরিকল্পনা করবে।’

তার দাবি, বাঁধ ও জলাধার নিয়ে দুই দেশের প্রকৃত বোঝাপড়া আদালতের রায়ের থেকে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া তা কার্যত অসম্ভব। সেই সঙ্গে, পাকিস্তানকেও দেখাতে হবে যে সন্ত্রাসবাদকে তারা একেবারেই মদত দেয় না।

পাকিস্তানের ওপর চাপ বাড়াতে পারে ভারত

পাকিস্তানে ভারতের সাবেক হাই কমিশনার অজয় বিসারিয়া মনে করেন, আগামী বছরগুলোতে পানি নিয়ে পাকিস্তানের ওপর আরো চাপ বাড়াতে পারে ভারত। 

তিনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে এই নদীগুলিতে খাল কেটে, জলাধার তৈরি করে পাকিস্তানকে আরও চাপে ফেলতে পারে ভারত।’ তিনি উল্লেখ করেন, বাঁধ নির্মাণ, বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চুক্তি সংশোধন, এমনকি সমাপ্তিকরণেরও অনুমোদন রয়েছে। তার মতে, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদকে কতটা দমন করতে পারে, তার ওপরেই নির্ভর করবে পানির প্রবাহ।

আরও পড়ুন

যেকোনো মূল্যে পানির অধিকার রক্ষা করবে পাকিস্তান: শেহবাজ

ভারত বাঁধ নির্মাণ করলে মিসাইল মেরে গুঁড়িয়ে দেবো: পাকিস্তান

সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের উপর নির্ভরশীল পাকিস্তান

খাবার পানি ও কৃষিকাজের জন্য এই তিন নদীর ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তানের এক বড় অংশ। দেশটির কৃষির মূল কাঠামো এই নদীর পানি। 

দক্ষিণ এশিয়ার ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস ও ইকোনমিক বিশেষজ্ঞ মহেন্দ্র লামার কথায়, ‘জলসম্পদ বণ্টনের জন্য সামরিক সংঘাতের বদলে কূটনীতি প্রয়োজন। সেই সঙ্গে সহযোগিতা।’

সম্মুখ কূটনীতি না নেপথ্য কূটনীতি, প্রয়োজন কোনটি

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ উত্তম কুমার সিনহা তিনটি কার্যকরী পন্থার দিকে ইঙ্গিত করেন। তার কথায়, ‘প্রথমেই একটি সীমিত তথ্য সংক্রান্ত সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা। সেই সঙ্গে প্রকল্প নির্দিষ্ট অডিট এবং নেপথ্য কূটনীতির সাহায্যে মরসুম অনুযায়ী জলবণ্টন বা পলি অপসারণ নিয়ে একমত হতে পারে।'' 

তার দাবি, এই ধরনের বাস্তব ও যুক্তিসম্মত পদক্ষেপ ছাড়া সামরিক সংঘাত তো ঘটবেই, নদীগুলির পরিস্থিতিও বিচার করা কঠিন হয়ে যাবে। যা সাধারণ মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠবে ক্রমশ।

সূত্র: ডয়চে ভেলে

এমএইচআর