images

আন্তর্জাতিক

‘আমরা তো সব হারিয়েছি, ঈদটা কষ্টের’— কাঁদতে কাঁদতে গাজার বাসিন্দা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

৩১ মার্চ ২০২৫, ০৮:০০ এএম

images

ফিলিস্তিনের গাজায় রোববার ঈদুল ফিতর পালিত হলেও, সেখানে ঈদের আনন্দ ছিল না। ইসরায়েলের একের পর এক নৃশংস হামলায় বিধ্বস্ত এই উপত্যকায় আজও কেঁপে উঠছে আতঙ্কের ছায়া। ঈদের দিনেও গাজার মানুষ ছিলেন না নিরাপদে। মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এই দিনটিতেও, অন্তত ৩৫ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের চোখের পানি আর শোকের মধ্যে ঈদের নামাজ আদায় করতে হয়েছে, কিন্তু এই নামাজে কোনো সুখ ছিল না, ছিল বেদনা।

১৭ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা হামলার ফলে গাজায় আর কোনো মসজিদ অবশিষ্ট নেই। তাই রোববার, ঈদের দিন, হাজার হাজার মানুষ ধ্বংস হয়ে যাওয়া মসজিদের বাইরে নামাজ আদায় করতে বাধ্য হন। আগে ঈদের দিনগুলোতে গাজার শিশুরা নতুন পোশাক পরিধান করে আনন্দিত হয়ে ছুটাছুটি করত, কিন্তু আজ তাদের সামনে শুধু ক্ষুধা ও আতঙ্ক। ঈদের খাবারও ছিল না, রান্নাঘরে কোনো বিশেষ আয়োজন ছিল না।

গাজার বাসিন্দা আদেল আল-শায়ের, যিনি ঈদের নামাজ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েন, বলেন, ‘এই ঈদটা কষ্টের। আমরা আমাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছি। আমাদের সন্তান, আমাদের জীবন, আমাদের ভবিষ্যৎ—সবকিছু... আমরা তো সব হারিয়েছি।’ তার কথায় যেন গাজার সমস্ত বেদনা, কষ্ট আর শূন্যতা প্রতিফলিত হয়।

অন্য একজন গাজার বাসিন্দা, সায়েদ আল-কুর্দ, এদিন বলেন, ‘এখানে হত্যা করা হচ্ছে, মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, সবাই ক্ষুধার্ত। আমাদের অবরোধ করে রাখা হয়েছে। আমরা শুধু আমাদের শিশুদের একটু আনন্দ দিতে বাইরে বেরিয়েছি। কিন্তু, ঈদের আনন্দ কোথায়? এখানে তো কোনো ঈদ নেই।’

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর গাজার ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গাজার স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে, গত ১৭ মাসে ৫০ হাজার ২৭৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আহত ১ লাখ ১৪ হাজারেরও বেশি, আর আহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এ ছাড়া বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ।

রোববার, ঈদের দিনে, আবারও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস ও রাফাসহ বিভিন্ন স্থানে বাড়ি ও তাঁবু লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। গাজার একটি এলাকা, খান ইউনিসে হামলার আগে ওমর আল-কাদি বলেন, ‘ঈদের আনন্দে, শিশুরা অপেক্ষা করছিল কখন ভোর হবে, ঈদ উদ্‌যাপন শুরু হবে, কিন্তু রাত সাড়ে ১২টার দিকে শত্রুদের যুদ্ধবিমান তাদের শান্তিপূর্ণ তাঁবুতে হামলা চালায়।’

গাজার স্থানীয় বাসিন্দা আহমাদ আল-নাজ্জার বলেন, ‘ঈদের দিন, শিশুরা তাদের সবচেয়ে সুন্দর পোশাক বের করেছিল, কিন্তু বোমাবর্ষণের কারণে তাদের কেউ পরতে পারেনি। এটি ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ঈদ।’

এদিকে, গাজায় খাদ্য সংকটও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইসরায়েল ২ মার্চ থেকে গাজার ক্রসিংগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে, ফলে ত্রাণ সহায়তা প্রবেশ করতে পারছে না। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, তাদের কাছে খাবারের মজুত আর মাত্র ১০ দিনের জন্য রয়েছে। আর পানি সংকটও তীব্র। উত্তর গাজার জাবালিয়ায় পানির মজুত শেষ হয়ে গেছে। এক বাসিন্দা, ইনশিরাহ হানোউনেহ, বলেন, ‘এটা ঈদের দিন, কিন্তু এই তিক্ত জীবনে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই কষ্টে রয়েছে। এই দিন তাদের জন্য খুশি আনেনি। গত রাত থেকে পানি নেই। পানির এক ফোটা পাওয়া যাচ্ছে না। যুদ্ধ হয়েছে, শান্তি চাই।’

যখন গাজার বাসিন্দারা ঈদের নামাজ আদায় করছিলেন, তখনও সেখানে কামানের গোলার শব্দ ভেসে আসছিল, আকাশে ড্রোন উড়ছিল। খান ইউনিসের নাহলা আবু মাতার, যিনি ২৮ বছর বয়সী, জানান, ‘এক সময় ঈদ ছিল পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এবং বেড়াতে যাওয়ার দিন, কিন্তু আজ তা শেষ বিদায় নেওয়ার, নিহতদের দাফন-কাফন করার দিনে পরিণত হয়েছে।’ সূত্র: আল জাজিরা

এইউ