আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৬ জুলাই ২০২৩, ০১:৩৭ পিএম
মুসলমানদের কেবলা পবিত্র মক্কা বা কাবা শরিফ। এ ঘর মহান আল্লাহ তায়ালার এক অপূর্ব সৃষ্টি। প্রতি বছর লাখ লাখ মুসলমান কাবাঘর তওয়াফ করতে মক্কা গমন করেন। আরবি নান্দনিক ক্যালিগ্রাফিতে খচিত কালো গিলাফে ঢাকা পবিত্র এ কাবা শরিফ মুসলিম উম্মাহর আবেগ-অনুভূতির সর্বোচ্চ স্থান। কাবার এ কালো গিলাফ-কে কিসওয়া বলা হয়। এ গিলাফ যেন কাবা শরিফকে অপার্থিব গভীর ভালবাসায় জড়িয়ে রেখেছে। এই গিলাফ তৈরিতে প্রতি মিটারে দশ ধাপে লাগানো হয় ৯৯০০ সুতা।
পৃথিবীতে সর্বপ্রথম আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা কাবাঘর নির্মাণ করেন। কাবাঘরকে লক্ষ্য করে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনুল কারিমে সূরা আলে-ইমরানের ৯৬ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘নিশ্চয়ই সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের ইবাদতগাহরূপে নিরূপিত হয়েছে, তা ওই ঘর যা মক্কাতে অবস্থিত।’
পবিত্র কাবাঘরকে ঘিরে রাখা এ গিলাফের আর্ট ও সোনার সুতায় বোনা ক্যালিগ্রাফি মুমিন মুসলমানের হৃদয়ে তৈরি হয় ভাললাগা এবং ভালবাসা। অনুভূত হয় অন্যরকম এক মায়াবি আকর্ষণ।
সৌদি আরবের উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. নাসের বিন আলি আল-হারেসির তথ্য থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে পবিত্র কাবা শরিফে গিলাফ ব্যবহৃত হতো না। কাবাঘরে গিলাফ ব্যবহারের সঠিক তারিখ জানা না গেলেও পবিত্র নগরী মক্কা ও তায়েফে প্রাপ্ত শিলালিপিতে খচিত আরবি ক্যালিগ্রাফি সূত্রে জানা যায়, ৪০ হিজরি সনের দিকে আরবি ক্যালিওগ্রাফির উন্নত স্টাইল তখন অধিক প্রচলিত ছিল। বর্তমান সময়ে একই স্টাইলের আদলেই পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফে সোনার সুতায় আরবি ক্যালিগ্রাফি খচিত হচ্ছে।
9900 thread of silk per meter and ten stages for making the Kiswah of Kaaba!
Posted by Haramain Sharifain on Sunday, July 16, 2023
১৩৪৬ হিজরিতে কাবা শরিফের গিলাফ তৈরিতে বিশেষ কারখানা তৈরির বিষয়টি সামনে আসে এবং তৎকালীন সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজ আল-সৌদের নির্দেশক্রমে গিলাফ বা কিসওয়া তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৩৪৬ সালে ওই কারখানায় নির্মিত অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ক্যালিওগ্রাফিতে সজ্জিত কালো গিলাফ দ্বারা আবৃত করা হয় পবিত্র কাবা শরিফ।
কাবা শরিফের গিলাফের বাইরের কালো কাপড়ে স্বর্ণমণ্ডিত রেশম সুতা দিয়ে দক্ষ কারিগর দিয়ে ক্যালিগ্রাফি করা হয়। এরপর ঝারনিখ কালি দিয়ে প্রথমে কাপড়ে ক্যালিগ্রাফির আউটলাইন দেয়া হয়, তারপর কারিগররা হরফের ভেতর রেশম সুতার মোটা লাইন বসিয়ে স্বর্ণের সুতা দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে হরফ ফুটিয়ে তোলেন। গিলাফের কালো জমিনে স্বর্ণের সুতার ঢেউ খেলানো বুননের ক্যালিওগ্রাফির সোনালি আভা এক জান্নাতি আবেশ ছড়িয়ে দেয়। হজরে আসওয়াদের ওপর অংশে আল্লাহু আকবর ক্যালিগ্রাফিসহ বর্তমানে গিলাফের অধিকাংশ ক্যালিগ্রাফি মুখতার শোকদারের হস্তলিখিত।
প্রতি বছর কাবা শরিফের গিলাফ পবিত্র হজের দিন সকালে (৯ জিলহজ) পরিবর্তন করা হয়। কাবা শরিফের গিলাফ নির্মাণে যেসব জিনিসপত্র প্রয়োজন সেগুলো তৈরির বিশেষ কারখানা মক্কার উম্মুল জুদ এলাকায় অবস্থিত। নতুন গিলাফ তৈরি করতে দরকার হয় ১২০ কেজি সোনার সুতা, ৭০০ কেজি রেশম সুতা ও ২৫ কেজি রুপার সুতা। গিলাফটির দৈর্ঘ্য ১৪ মিটার এবং প্রস্থ ৪৪ মিটার। গিলাফের সেলাই কাজে অংশগ্রহণ করেন দেড় শতাধিক অভিজ্ঞ দরজি। গিলাফ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় বিশেষ মেশিন। কালো সিল্কের কাপড়ের ওপর কোরআনুল কারিমের আয়াত অঙ্কনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় সোনা ও রুপার তৈরি সুতা। কাবা শরিফের গিলাফ তৈরির পর তা বিশেষ বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়ায় তাপ দেয়া হয়। যাতে তা প্রচণ্ড রোদ ও তাপেও অবিকৃত থাকে।
পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ একটি বস্ত্রখণ্ড যা দ্বারা কাবাকে আচ্ছাদিত করে রাখা হয়। বর্তমানে গিলাফ কালো রেশমী কাপড় নির্মিত, যার ওপর স্বর্ণ দিয়ে লেখা থাকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলাল্লাহ’, ‘আল্লাহু জাল্লে জালালুহু’, ‘সুবহানাল্লাহু ওয়া বেহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আযিম’ এবং ‘ইয়া হান্নান, ইয়া মান্নান’।
সূত্র: আরব নিউজ ও হারামাইন শরিফাইন
একে