মাহফুজ উল্লাহ হিমু
১০ অক্টোবর ২০২২, ০৯:১০ এএম
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মানসিক স্বাস্থ্য। তবে আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বেশকিছু স্টিগমা রয়েছে। যা দেশের মানসিক স্বাস্থ্য সেবার পথে অন্তরায়। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় মানসিক রোগীকে পাগল হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। ফলে এসব রোগে ভোগা ব্যক্তিরা চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে, তা গোপন করার চেষ্টা করেন। ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। এ অবস্থায় মানসিক রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি আত্মহত্যাসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটছে।
তবে মহামারী করোনাকালে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। সারাবিশ্বে এর প্রভাব দৃশ্যমান। করোনা পরবর্তীকালে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। এই বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থার বড় আঘাত পড়েছে বাংলাদেশেও। এ সংক্রান্ত গবেষণা তথ্যমতে, করোনাকালে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় শীর্ষে বাংলাদেশ।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এ সংক্রান্ত জরিপে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, করোনা-সম্পর্কিত উদ্বেগজনিত অসুস্থতার হার সাধারণ উদ্বেগজনিত অসুস্থতার হারের চেয়ে শতকরা ৬ শতাংশ বেশি। হাসপাতালটির জরিপ প্রতিবেদন অনুসারে, মানসিক অসুস্থতা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে শতকরা ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আঁচল ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মোট অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫৭ দশমিক ৯৯ শতাংশই জানিয়েছেন যে তাদের নিজস্ব শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অতিরিক্ত ভয় ও উদ্বেগ তাদের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। এর পাশাপাশি দৈনন্দিন আচার-আচরণ ও ব্যবহারে পরিবর্তন, যেমন- মন খারাপ হওয়া, হঠাৎ ক্লান্তি আসা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে শিক্ষাজীবনে প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন ৮০ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। দেশের ৩৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ৪৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ মাদরাসা ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট এক হাজার ৬৪০ জন শিক্ষার্থী এই গবেষণায় অংশ গ্রহণ করেছেন।
এ অবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যে গুরুত্বারোপের কথা বলেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। এ লক্ষ্যে মানসিক চিকিৎসা সংক্রান্ত কুসংস্কার ও স্টিগমা দূর করতে কার্যকর প্রদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
স্টিগমা দূর করা জরুরি
জানতে চাইলে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, মানসিক রোগের ক্ষেত্রে সমাজে বেশকিছু স্টিগমা রয়েছে। এ বিষয়ে সমজে লোক লজ্জার বিষয় রয়েছে। এসব কারণে কেউ নিজেকে মানসিক রোগী হিসেবে প্রকাশ করতে চায় না। সকলের আড়লে তারা চিকিৎসকের কাছে আসেন, নয়তো পরিবারের লোকজনও হয়তো তাকে পাগল বলবে। কারণ সে পাগলের ডাক্তারের কাছে গেছে। এইসব কারণেই অনেক মানুষ মানসিক রোগকে আড়ালে রাখে অথবা লুকিয়ে চিকিৎসকের কাছে যায়। এটি মানসিক রোগীদের চিহ্নিত করা ও চিকিৎসার আওতায় আনার ক্ষেত্রে একটি বড় বাঁধা। এটি দূর করতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যে, এটা পাগলামি না। এটি একটি সাধারণ ব্রেনের রোগ। আর দশটা রোগের মতো এটিও স্বাভাবিক। এর জন্য লজ্জিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সকলকে জনাতে হবে এর সুচিকিৎসা রয়েছে। তাই অন্যান্য রোগের মতো অল্প সময়ে যদি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায় তাহলে রোগী দ্রুত ভালো হয়ে যাবে।
মানসিক রোগের চিকিৎসার সময়কাল তুলে ধরে তিনি বলেন, মানসিক রোগ তো একটি সুনির্দিষ্ট রোগ না। এর একাধিক ধরন রয়েছে। একটি ধরনের মধ্যে অসংখ্য লক্ষণ রয়েছে। যেমন সিজোফ্রেনিয়া, সিজো এফেক্টিভ, ডিপ্রেশন, ম্যানিয়া, অবসেশন ইত্যাদি। একেকটি রোগের একেক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি। কোনোটি স্বল্প সময়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়, পরে ফলোআপে রাখা হয়। কোনো রোগীকে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা দিতে হয়। রোগ ও রোগীর অবস্থার উপর চিকিৎসার সময় অনেকাংশেই নির্ভর করে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. রাইসুল ইসলাম পরাগ বলেন, মানসিক চিকিৎসায় অন্যতম বড় সমস্যা স্টিগমা। কেউ মানসিক চিকিৎসকের কাছে গেলে অন্যরা জিজ্ঞেস করে সেই ব্যক্তি পাগল কিনা। এটা দূর করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য গুরুত্বের বিষয় জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে অনেক মানুষ মনোরোগের চিকিৎসকের কাছে যায়। সাধারণ রোগের থেকেও বেশি রোগী মানসিক সমস্যায় পরামর্শ নেয়। অথচ আমাদের দেশে তার ভিন্ন চিত্র। তবে আমাদের দেশে এ সংক্রান্ত লোকবলেরও ঘাটতি আছে।’
মানসিক রোগ বাড়ায় বাড়ছে আত্মহত্যা
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৪০৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। যার মধ্যে নারী শিক্ষার্থী রয়েছে ২৪২ জন এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ১৬২ জন। আঁচল ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব চিত্র।
তাদের তথ্যমতে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছেন ৪০৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৫৭ জন, স্কুলের ২১৯ জন, মাদরাসার ৪৪ জন এবং কলেজপড়ুয়া ৮৪ জন। আত্মহননকারীদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ২৪২ জন এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ১৬২ জন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সময়ে আত্মহত্যা বাড়ার কারণ মানসিক সমস্যা। সকল আত্মহত্যা মানসিক সমস্যার কারণে ঘটে থাকে। ডিপ্রেশনজনিত রোগগুলোতে তাদের এমন অনুভূতি হয় যে, এই জীবন রেখে কি হবে। সেটার কারণে আত্মহত্যা করে, অনেকে রাগে অভিমানে আত্মহত্যা করে। এই জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে সকলকে নজর দিতে হবে এবং সচেতন হতে হবে।

ডা. রাইসুল ইসলাম বলেন, সুইসাইড একটি কমপ্লেক্স ফিনোমেনা, অনেকগুলো বিষয়ের মিথস্ক্রিয়ার ফলে এটি ঘটে থাকে। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো কারণকে এককভাবে দায়ী করা যাবে না। মানসিক অস্থিরতা থাকলে আত্মহত্যা প্রবণতা বেড়ে যায়। এর আরও নানাবিধ কারণ রয়েছে। এটি মোকাবিলায় শিক্ষার্থীসহ সকলের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারো আচার-আচরণে পরিবর্তন দেখলে তাকে সময় দিতে হবে। সন্তানদের মতামত নিতে হবে। তাদেরকে অন্যদের সাথে তুলনা করা যাবে না। এতে মানসিক সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। আত্মহত্যা প্রবণতাও হ্রাস পায়।
গণমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ সংক্রান্ত বেশ কিছু নীতিমালাও রয়েছে, গণমাধ্যমের জন্যেও দিক-নির্দেশনা রয়েছে। যেমন: আত্মহত্যার সংবাদ কখনও প্রথম পেজে থাকতে পারবে না। আত্মহত্যার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া যাবে না। কোনো সুইসাইড নোট কখনওই পাবলিশ করা যাবে না। এমনকি সেলেব্রিটিদের আত্মহত্যার সংবাদ ঢালাওভাবে প্রচার না করতে বলা হয়েছে। এইগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা। দুঃখজনকভাবে তা অনুসরণ করা হয় না।
এমএইচ/এএস