নিজস্ব প্রতিবেদক
০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকডু) হাসপাতালে স্যান্ডোরের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেখানে নিয়মিত ডায়ালাইসিস নেওয়া ১৩০ জন কিডনি রোগী। তাদের আশঙ্কা, স্যান্ডোরের পরিবর্তে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস চালু হলে বর্তমান সেবার ধারাবাহিকতা ও মান ব্যাহত হতে পারে। তাই প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন হলেও পিপিপির অধীনে ডায়ালাইসিস সেবা চালু রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ হলে সংবাদ সম্মেলনে রোগীদের পক্ষ থেকে এসব দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১৭ সালে ক্রমবর্ধমান কিডনি রোগীর সংখ্যা এবং ডায়ালাইসিস সেবার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় ১০ বছরের চুক্তিতে ভারতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান স্যান্ডোরের সঙ্গে পিপিপি চুক্তি করে সরকার। এর আওতায় নিকডু হাসপাতালে ৫৯টি মেশিন নিয়ে ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু করা হয়। চুক্তিতে আরও ১০ বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
রোগীদের দাবি, বর্তমানে এই কেন্দ্রে ১৩০ জন নিয়মিত ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে ১৮ জন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেবা পাচ্ছেন। অন্যরা সরকারি ভর্তুকিমূল্যে প্রতি সেশনে ৫২১ টাকা দিয়ে ডায়ালাইসিস করাতে পারছেন। ডায়ালাইসিসের প্রয়োজনীয় ডায়ালাইজার, ওষুধ, টিউব, সিরিঞ্জ, স্যালাইন, স্যানিটাইজার ও গ্লাভসসহ আনুষঙ্গিক উপকরণও প্রতিষ্ঠান থেকে সরবরাহ করা হয়।
রোগীরা জানান, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সপ্তাহে এক, দুই কিংবা তিন দিন ডায়ালাইসিসের সময়সূচি নির্ধারণ করা যায়। কেন্দ্রটি সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। একবার সময়সূচি নির্ধারণ হলে তা দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকে। জরুরি প্রয়োজনে অতিরিক্ত সেশন নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে সময়সূচি পরিবর্তনেরও সুযোগ রয়েছে। সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও দক্ষ টেকনিশিয়ানের সহায়তা এবং বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবাও পাওয়া যায়।
সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, ডায়ালাইজার পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে অটোমেটেড মেশিনে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তা পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা হয়। হেপাটাইটিস বি ও সি পজিটিভ রোগীদের জন্য পৃথক মেশিন এবং তাদের প্রতিটি সেশনে নতুন ডায়ালাইজার ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে।
রোগীদের ভাষ্য, চুক্তি নবায়ন না হলে তাদের বর্তমান সেবাব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, নিকডুর পরিচালক এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন ও যোগাযোগ করেছেন। তাদের দাবি, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, নতুন মেশিন কেনার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে। পাশাপাশি নতুন জনবল নিয়োগের জন্য নার্স বাছাই ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্যান্ডোরের বর্তমান কেন্দ্রের একই স্থানে নতুন মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে হাসপাতালের নিজস্ব পানি বিশুদ্ধকরণ (আরও) প্ল্যান্ট ও অক্সিজেন প্ল্যান্ট থাকায় দ্রুত সেবা চালুর সুবিধা হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে নতুন মেশিন স্থাপনে প্রায় ছয় মাস সময় লাগতে পারে। এ সময় রোগীদের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডায়ালাইসিস করানোর কথা বলা হয়েছে।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস সেবা নিয়ে নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন রোগীরা। তাদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে ছয় মাসের ডায়ালাইসিসের জন্য অগ্রিম ২০ হাজার টাকা জমা দিতে হয়। কোনো রোগী নির্ধারিত সময়ের আগেই মারা গেলে অব্যবহৃত সেশনের টাকা ফেরত পাওয়া যায় না। একজন রোগী সপ্তাহে সর্বোচ্চ দুইবার ডায়ালাইসিসের সুযোগ পান। অথচ অনেক রোগীর সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়।
তাদের অভিযোগ, সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাসে একজন রোগীর জন্য দুটি ডায়ালাইজার বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে একই ডায়ালাইজার একাধিকবার ব্যবহার করতে হয়। যেসব রোগীর প্রতিবার নতুন ডায়ালাইজার প্রয়োজন, তাদের বাড়তি খরচে তা কিনতে হয়। ডায়ালাইজার পরিষ্কারের ক্ষেত্রেও অটোমেটেড মেশিনের পরিবর্তে ম্যানুয়াল পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন তারা। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
এ ছাড়া রোগীর তুলনায় জনবল কম, মেশিন বিকল থাকা, নির্ধারিত সময়ের আগে ডায়ালাইসিস বন্ধ করে দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকটের অভিযোগও রয়েছে। রোগীদের দাবি, চার ঘণ্টার ডায়ালাইসিস অনেক সময় দুই থেকে তিন ঘণ্টায় শেষ করতে হয়। প্রেসার ও ওজন মাপার যন্ত্র নষ্ট থাকায় সঠিকভাবে আল্ট্রাফিলট্রেশন নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। হ্যান্ড স্যানিটাইজার, গ্লাভস, টেপ ও স্যালাইনের মতো উপকরণও অনেক সময় রোগীদের নিজেদের কিনতে হয়।
রোগীদের আরও অভিযোগ, নতুন রোগীদের ক্ষেত্রে শুরুতেই হেপাটাইটিস পরীক্ষা না করানোর কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি ডায়ালাইসিসের প্রয়োজনীয় ডায়ালাইসেটের সরবরাহ না থাকলে সেটিও রোগীদের কিনতে হয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবেও সেবা ব্যাহত হয়।
তাদের দাবি, এসব কারণে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস করাতে প্রকৃত খরচ প্রতি সেশনে অন্তত দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দাঁড়ায়। ফলে কর্তৃপক্ষের বলা ৫১৭ টাকায় ডায়ালাইসিসের বিষয়টি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এসব বিবেচনায় স্যান্ডোরের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না হলেও বর্তমান সেবাব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখার দাবি জানিয়েছেন রোগীরা। তাদের প্রস্তাব, স্যান্ডোরের পরিবর্তে দেশীয় কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে পিপিপির আওতায় প্রকল্পটি চালু রাখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্যান্ডোরের বিদ্যমান অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল কাজে লাগানোরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সম্মেলনে বলা হয়, স্যান্ডোর ভারতীয় প্রতিষ্ঠান হলেও ঢাকার শাখায় কর্মরত একজন ছাড়া বাকি সবাই বাংলাদেশি। গত ১০ বছরে তারা ডায়ালাইসিসের মতো বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষতা অর্জন করেছেন। চুক্তি নবায়ন না হলে তাদের কর্মসংস্থানও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
রোগীদের অভিযোগ, সরকার অন্য পাঁচটি হাসপাতালের সঙ্গে পিপিপি চুক্তির উদ্যোগ নিলেও নিকডুর এই প্রকল্পকে একই ব্যবস্থার বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত বৈষম্যমূলক। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা এবং রোগীদের আস্থা অর্জন করা একটি সেবাপ্রকল্প বন্ধ না করে বরং এর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সম্মেলনে রোগীরা বলেন, চিকিৎসা পাওয়া মানুষের মৌলিক ও মানবিক অধিকার। কোনো কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে রোগীদের জীবন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তাদের দাবি, বর্তমান সেবার সুযোগ-সুবিধা অক্ষুণ্ণ রেখে ১৩০ জন নিয়মিত রোগীসহ প্রায় ১২০০ ডায়ালাইসিস প্রত্যাশী মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের ভাষ্য, কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই সেবা পরিচালনা করবে, তা নিয়ে তাদের আপত্তি নেই। তারা শুধু আগের মতো নিয়মতান্ত্রিক ও নিরবচ্ছিন্ন ডায়ালাইসিস সেবা চান। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া বা সেশন ফির কারণে কোনো কিডনি রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে প্রাণ না হারান, সে বিষয়ে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
এম/এএস