Dhaka Mail Logo

হেলথ

স্ট্রোক হওয়ার পর প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ

২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৪ এএম

স্ট্রোক এমন একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি, যেখানে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া কিংবা কথা বলতে অসুবিধা হওয়া—এসব স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এ সময় রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া গেলে মৃত্যুঝুঁকি কমানো এবং স্থায়ী পঙ্গুত্ব প্রতিরোধের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও অনেকে বাড়িতে অপেক্ষা করেন, ঝাড়ফুঁক বা ঘরোয়া চিকিৎসার আশ্রয় নেন কিংবা হাসপাতালে যেতে দেরি করেন। এই বিলম্ব রোগীর জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

স্ট্রোক হলে কী করবেন?

স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে প্রথম কাজ হলো দ্রুত জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব এমন হাসপাতালে নিতে হবে, যেখানে মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান বা এমআরআই এবং প্রয়োজনীয় স্ট্রোক চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।

স্ট্রোকের লক্ষণ মনে রাখার সহজ উপায় হলো ‘BE FAST’।

B—Balance: হঠাৎ ভারসাম্য হারানো বা হাঁটতে অসুবিধা।
E—Eyes: হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা ঝাপসা দেখা।
F—Face: মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া।
A—Arms: এক হাত বা পা দুর্বল হয়ে যাওয়া।
S—Speech: কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বুঝতে অসুবিধা।
T—Time: সময় নষ্ট না করে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া।

এগুলোর যেকোনো একটি লক্ষণ হঠাৎ দেখা দিলেও স্ট্রোকের আশঙ্কা করতে হবে। লক্ষণ কয়েক মিনিটের মধ্যে ভালো হয়ে গেলেও অবহেলা করা যাবে না। এটি ক্ষণস্থায়ী মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহের সমস্যা বা ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (টিআইএ) হতে পারে, যা পরবর্তী স্ট্রোকের সতর্কসংকেত।

স্ট্রোকে কেন প্রতি মিনিট জরুরি?

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে আক্রান্ত অংশে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায়। ফলে মস্তিষ্কের কোষ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। বড় রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে প্রতি মিনিটে প্রায় ১৯ লাখ স্নায়ুকোষ নষ্ট হতে পারে। যত দেরিতে চিকিৎসা শুরু হয়, মস্তিষ্কের ক্ষতি, পঙ্গুত্ব ও মৃত্যুর ঝুঁকি তত বাড়ে। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছালে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে থ্রম্বোলাইসিস বা মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমির মাধ্যমে রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তাই মুখ বেঁকে যাওয়া, হাত দুর্বল হওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি নয়—দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। স্ট্রোকে সময়ই মস্তিষ্ক, সময়ই জীবন।

প্রথমেই জানতে হবে, স্ট্রোকের ধরন কী

স্ট্রোক প্রধানত দুই ধরনের। ইস্কেমিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি রক্তের জমাট দিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে, হেমোরেজিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হয়।

দুই ধরনের স্ট্রোকের চিকিৎসা এক নয়। তাই রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দ্রুত সিটি স্ক্যান বা প্রয়োজন অনুযায়ী এমআরআই করে স্ট্রোকের ধরন নির্ণয় করা জরুরি। পরীক্ষা ছাড়া স্ট্রোকের ধরন নিশ্চিত হওয়া যায় না।

এ কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন, ক্লোপিডোগ্রেল বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকে এসব ওষুধ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।

brain-stroke_20260125_160511998

রক্তনালি বন্ধ হলে আছে কার্যকর চিকিৎসা

ইস্কেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে মস্তিষ্কের ক্ষতি কমানোর সুযোগ থাকে। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে শিরাপথে রক্তের জমাট গলানোর ওষুধ দেওয়া যায়। সাধারণত উপসর্গ শুরুর সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে এই চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা, সিটি স্ক্যানের ফলাফল, অন্যান্য পরীক্ষা এবং ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা আছে কি না, তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

কিছু নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে উন্নত ইমেজিংয়ের সাহায্যে আরও দীর্ঘ সময় পরও এই চিকিৎসা বিবেচনা করা যেতে পারে।

বড় রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে, অর্থাৎ লার্জ ভেসেল অক্লুশন (এলভিও) হলে, মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা। এ পদ্ধতিতে সাধারণত কুঁচকি বা হাতের ধমনির মাধ্যমে ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে মস্তিষ্কের বন্ধ রক্তনালিতে পৌঁছানো হয়। এরপর বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে রক্তের জমাট অপসারণ করে রক্তপ্রবাহ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়।

উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত থ্রম্বেকটমি করালে মৃত্যুঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা কমানো সম্ভব। নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে উপসর্গ শুরুর ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যেও এ চিকিৎসা উপকারী হতে পারে। তবে সব রোগী এই চিকিৎসার উপযুক্ত নন। দ্রুত সিটি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি বা প্রয়োজনীয় রক্তনালির ইমেজিং এবং বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন জরুরি।

রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের চিকিৎসা

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে চিকিৎসার লক্ষ্য হলো রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্তক্ষরণ বৃদ্ধি রোধ, মস্তিষ্কের ভেতরের চাপ সামলানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচার বা এন্ডোভাসকুলার চিকিৎসা করা।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অ্যানিউরিজম বা রক্তনালির অস্বাভাবিকতা থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্লিপিং, কয়েলিং বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে রক্তক্ষরণের উৎস বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোগীকে স্ট্রোক ইউনিট বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রেখে চিকিৎসা দেওয়া জরুরি হতে পারে।

হাসপাতালে নেওয়ার আগে যা করবেন না

স্ট্রোকের রোগীকে খাবার, পানি বা মুখে খাওয়ার ওষুধ দেবেন না। কারণ, রোগীর গিলতে অসুবিধা থাকলে খাবার বা পানি শ্বাসনালিতে ঢুকে যেতে পারে। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া রক্তচাপ দ্রুত কমানোর চেষ্টা করবেন না। রোগীকে হাঁটাচলা করানো, মালিশ করা কিংবা ঝাড়ফুঁকের পেছনে সময় নষ্ট করাও উচিত নয়।

আরও পড়ুন: ব্রেন স্ট্রোক: প্রথম চার মিনিট অতি গুরুত্বপূর্ণ 

রোগী কখন শেষবার স্বাভাবিক ছিলেন, সেই সময়টি মনে রাখুন। উপসর্গ কখন শুরু হয়েছে, কী কী ওষুধ খান এবং আগে থেকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্‌রোগ আছে কি না—এসব তথ্য চিকিৎসককে জানান। রোগী অচেতন হলে শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করুন এবং জরুরি সহায়তা নিন।

প্রতিরোধের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসার প্রস্তুতি

স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বর্জন, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস জরুরি। অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন, বিশেষ করে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন, শনাক্ত ও চিকিৎসা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

পাশাপাশি প্রয়োজন স্ট্রোক চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত হাসপাতাল, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, দ্রুত ইমেজিং এবং উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে থ্রম্বোলাইসিস ও থ্রম্বেকটমির ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষের মধ্যে স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যায়।

মনে রাখতে হবে, স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা—এই তিনটি বিষয়ই রোগীর জীবন বাঁচানো ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। স্ট্রোক হলে অপেক্ষা নয়, দ্রুত ব্যবস্থা নিন।

লেখক: 

সহযোগী অধ্যাপক 

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল 

himu33bd@gmail.com

এজেড