২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৩ পিএম
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘট চলছে। এতে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর এবং মৃত ব্যক্তিদের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যেতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্বজনরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে ভ্যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও পিকআপভ্যানে মরদেহ নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ধর্মঘটের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাদাত হোসেন।
তিনি জানান, হাসপাতালের নতুন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মো. ফরহাদ হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর হাসপাতাল প্রাঙ্গণ থেকে তাদের সব অ্যাম্বুলেন্স সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে তাদের দিয়ে জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করানো হয়। সেখানে সিসি ক্যামেরা, লাইট ও গেট স্থাপন করা হলেও পরবর্তী সময়ে সেখান থেকেও অ্যাম্বুলেন্স সরিয়ে দেওয়া হয়।
শাহাদাত হোসেন বলেন, হাসপাতালের বাইরে সড়কে অ্যাম্বুলেন্স রাখলেও পুলিশের সার্জেন্ট মামলা দেন। অথচ হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স রাখার ব্যবস্থা করতে তারা কয়েক লাখ টাকা খরচ করেছেন। এ পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে পার্কিংয়ের দাবিতে ধর্মঘট শুরু করেছেন তারা। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল থেকে তাদের সব অ্যাম্বুলেন্সের চলাচল বন্ধ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানে তারা সিসি ক্যামেরাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেছেন। সেখানে প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে সরকারকে রাজস্ব দিতেও তারা রাজি। পার্কিংয়ের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে বলে জানান তিনি।
ধর্মঘটের কারণে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা মো. শাহীন জানান, তার ৭০ বছর বয়সী দাদি হালিমা বেগমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়েছিল। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে তিনি মারা যান। এরপর মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অ্যাম্বুলেন্স খুঁজেও পাননি তারা।
শাহীন বলেন, “সরকারি হাসপাতালে এসেও এমন বিপদে পড়তে হবে, তা কখনো ভাবিনি। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও চোখে পড়েনি। স্বজন হারানোর শোকের মধ্যে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছি।”
যাত্রাবাড়ী থেকে আসা মোহাম্মদ মনির হোসেন জানান, তার বড় ভাগনে মো. রাসেল (২২) অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে রাসেলের মৃত্যু হয়। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুঁজেও পাননি তারা।
মনির হোসেন বলেন, “হাসপাতালের একজন চিকিৎসক আমাদের ভ্যানে করে মরদেহ নিয়ে যেতে বলেছেন। স্বজন হারানোর শোকের মধ্যে মরদেহ নেওয়ার গাড়ি না পেয়ে অসহায়ের মতো বসে আছি। এত বড় সরকারি হাসপাতালে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে, তা কল্পনাও করিনি।”
শুধু মরদেহ পরিবহন নয়, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরেও সংকট তৈরি হয়েছে। খুলনা থেকে গুরুতর আহত শাশুড়িকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন আব্দুল আহাদ। পরে তাকে কিডনি হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু দুপুর থেকে অ্যাম্বুলেন্স খুঁজেও পাননি বলে জানান তিনি।
আব্দুল আহাদ বলেন, “সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও পাওয়া যাচ্ছে না, কেউ কোনো সমাধান দিতে পারছেন না। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে। সময়মতো অন্য হাসপাতালে নিতে না পারলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকেই অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে অনেককে অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এমনকি পিকআপভ্যানেও রোগী ও মরদেহ নিয়ে যেতে দেখা গেছে। হাসপাতালের বাইরে থেকে কিছু অ্যাম্বুলেন্স এলেও রোগী ও স্বজনদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা মিলছে না বলে দাবি করেন তারা।
তাদের ভাষ্য, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক রোগী ও স্বজন অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছেন না। এ পরিস্থিতির সমাধানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের আলোচনায় বসা জরুরি।
অ্যাম্বুলেন্স পার্কিং নিয়ে বিরোধ, ধর্মঘট এবং রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগের বিষয়ে জানতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন ধরেননি। এ কারণে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘটের মধ্যে রোগী স্থানান্তর ও মরদেহ পরিবহনে সৃষ্ট সংকটের সমাধান না হওয়ায় ভোগান্তিতে রয়েছেন হাসপাতালটিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা।
এম এম আর/