নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১২ পিএম
হাসপাতালে রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়ার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দিতে চায় সরকার। এ জন্য নতুন হাসপাতাল নির্মাণের পরিবর্তে তৃণমূল পর্যায়ে রোগ প্রতিরোধ, শারীরিক অক্ষমতা কমানো ও অকালমৃত্যু ঠেকানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত ‘স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে চিকিৎসা প্রযুক্তির সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—আমি স্বাস্থ্যের প্রতিমন্ত্রী, হাসপাতালের প্রতিমন্ত্রী নই।’ তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবার প্রচলিত কাঠামোর পরিবর্তে রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে চায় সরকার। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন তৈরি হওয়া অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রাথমিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।
তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেট অব থিংসের (আইওটি) সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। তাঁদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দেশে অসংক্রামক রোগের বিস্তার বাড়ছে উল্লেখ করে ড. এম এ মুহিত বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের যাতে ঢাকায় ছুটতে না হয়, সে জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতেও এসব সেবা সম্প্রসারণ করা হবে।
চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যয় কমানোর উদ্যোগ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের প্রথম বাজেটে হার্টের রিং বা স্টেন্ট, ডায়ালিসিস ফিল্টার, সক্রিয় ওষুধ উপাদান (এপিআই) ও কৃত্রিম চোখের লেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের ওপর ভ্যাট ও কর কমানো বা মওকুফ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চিকিৎসাসামগ্রী আমদানির অনুমোদনপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানোর অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, অতীতে যে কমিটির বৈঠক দুই বছরেও হয়নি, গত পাঁচ মাসে সেই কমিটি তিনবার বৈঠক করে চিকিৎসাসামগ্রীর অনুমোদন দিয়েছে।
আমেরিকান বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে ড. এম এ মুহিত বলেন, বাংলাদেশে শুধু উচ্চমূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম বিক্রি করলেই হবে না। এসব যন্ত্রপাতির জীবনকালীন ব্যয়, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং স্থানীয় প্রকৌশলী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীদের চিকিৎসাপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা, স্থানীয়ভাবে চিকিৎসাযন্ত্রের যন্ত্রাংশ সংযোজন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা চান তিনি।
হাসপাতালে অব্যবহৃত ও অকেজো চিকিৎসাযন্ত্রের কার্যকারিতা তদারকিতে জাতীয় ই-হেলথ ও ডিজিটাল মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসাসহায়তায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন, আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের বাণিজ্যিক কাউন্সেলর পল জি ফ্রস্ট এবং মেডট্রনিক পিএলসি ও ইন্টেল করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. ওমর ইশরাক।
আলোচনায় অংশ নেন মেডট্রনিক বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মায়াঙ্ক ত্রিপাঠী, জিই হেলথকেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড ও ডিরেক্টর মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান রোমেল, বেকটন ডিকিনসনের বাংলাদেশ বিজনেস লিডার মির্জা সজীব রায়হান এবং অ্যামচেমের হেলথকেয়ার সাবকমিটির ইনচার্জ ডিরেক্টর ও ন্যাটকো বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল-মামুন এম রাসেল।
এম/এআর