জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম
আজ (১২ অক্টোবর) বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবস। ১৯৯৬ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী আর্থ্রাইটিস এবং অন্যান্য মাস্কুলোস্কেলেটাল রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরতে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
এ বছর বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আসুন স্বপ্ন পূরণ করি’। আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত রোগী যেন শারীরিক ব্যথা বা অক্ষমতার কাছে হার না মেনে সঠিক চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে তাদের জীবনের লক্ষ্য ও স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পারেন- এটিই এই প্রতিপাদ্যের মূল সুর।
বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবস উপলক্ষ্যে সোমবার (১২অক্টোবর) বাত ব্যথার রোগীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘প্রফেসর নজরুল রিউমাটোলজি ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ (পিএনআরএফআর) ট্রাস্ট’-এর পক্ষ থেকে বিশেষ বার্তা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংগঠনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম।
যিনি প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট, বাংলাদেশ রিউমাটোলজি সোসাইটি ও এশিয়া প্যাসিফিক লীগ অব অ্যাসোসিয়েশন ফর রিউমাটোলজির কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবেও কাজ করছেন।
বাংলাদেশের আর্থ্রাইটিস পরিস্থিতি ও বাস্তব চিত্র
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭১ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের আর্থ্রাইটিস ও মাস্কুলোস্কেলেটাল সমস্যায় আক্রান্ত। বাংলাদেশেও আর্থ্রাইটিস আজ এক আশঙ্কাজনক জনস্বাস্থ্য ও আর্থ-সামাজিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩০.৪% মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাস্কুলোস্কেলেটাল বা আর্থ্রাইটিসের সমস্যায় ভুগছেন, যার মধ্যে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার হার তুলনামূলক বেশি।
আর্থ্রাইটিস কেবল সামান্য জয়েন্ট ব্যথা বা অস্বস্তির বিষয় নয়; পরিসংখ্যান অনুযায়ী: আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ২৪.৮% কোনো না কোনো মাত্রার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হন।
একইসঙ্গে প্রায় ২৪.৪% রোগী বছরের কোনো না কোনো সময় সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতা হারান। আর একজন কর্মক্ষম মানুষ যখন কাজ করার ক্ষমতা হারান, তখন কেবল তার আয়ই বন্ধ হয় না, বরং তার ভবিষ্যৎ জীবনের অনেক সুন্দর স্বপ্নও থমকে যায়।
স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে অর্থনৈতিক চাপ
অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, স্পন্ডাইলোআর্থ্রাইটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলো একজন মানুষের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক সুস্থতা ও জীবনযাত্রার মান ক্ষুণ্ন করে।
আর্থ্রাইটিসের দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, ফিজিওথেরাপি, নানা পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের প্রত্যক্ষ ব্যয় রোগীর পরিবারের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে স্বাস্থ্য ব্যয়ের সিংহভাগ মানুষকে নিজ পকেট থেকেই বহন করতে হয়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি আর্থ্রাইটিস অনেক পরিবারকে ঋণগ্রস্ত করে তোলে এবং ধীরে ধীরে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়
বিশেষজ্ঞ সংকট ও বিলম্বিত চিকিৎসা
প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে প্রয়োজনের তুলনায় রিউমাটোলজি ও আর্থ্রাইটিস বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।
অথচ প্রাথমিক অবস্থায় আর্থ্রাইটিস ধরা পড়লে এবং সঠিক চিকিৎসা ও থেরাপি নিলে জয়েন্টের স্থায়ী ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব। জাতীয় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা ক্যানসারের মতোই আর্থ্রাইটিসের বিশাল অক্ষমতা ও অর্থনৈতিক বোঝাকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।
‘আসুন স্বপ্ন পূরণ করি’: করণীয় ও সুপারিশ
আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জীবনের স্বপ্ন ও লক্ষ্যগুলো বাঁচিয়ে রাখতে সম্মিলিত পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে এজন্য কিছু পরামর্শও দেয়া হয়েছে। তা হলো-
প্রাথমিক লক্ষণ চেনা ও দ্রুত চিকিৎসা: জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা ভাব বা শক্ত হয়ে যাওয়াকে অবহেলা না করে প্রাথমিক অবস্থাতেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, যাতে স্থায়ী পঙ্গুত্ব এড়ানো যায়।
সঠিক থেরাপি ও সুষম জীবনযাত্রা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক ওষুধ গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি ও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে জয়েন্টের সক্ষমতা ধরে রেখে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতায় ফিরে আসা। পাশাপাশি আর্থ্রাইটিসের রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অবশ্যই নিয়মিত ভ্যাকসিন নিতে হবে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা: আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এবং চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করা, যেন তারা সমাজে স্বনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বেঁচে থাকতে পারেন।
সবশেষ পিআরআরএফআরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবসে সবার অঙ্গীকার হোক- আর্থ্রাইটিসের কারণে কারও জীবন যেন থেমে না যায়। সঠিক চিকিৎসা, সচেতনতা ও সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে যেন প্রতিটি আক্রান্ত মানুষকে তাদের ‘স্বপ্ন পূরণের’ পথে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করা যায়।
বিইউ/এএইচ