নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
সম্প্রতি দেশের হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি হামের নজিরবিহীন এক প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। জাতীয় পর্যায়ে অতীতে টিকাদানের ভালো সাফল্য থাকলেও সম্প্রতি তা উদ্বেগজনক হারে কমে যাওয়ায় ২০০৫ সালের পর বাংলাদেশে অন্যতম প্রাণঘাতী মহামারি রূপে দেখা দিয়েছে হাম। বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ এর এক প্রতিবেদনে এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের (ডিজিএইচএস) পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশজুড়ে অন্তত এক লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এ সময় হাম ও হামজনিত নানা জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে অন্তত এক হাজার ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের সিংহভাগই দুই বছরের কম বয়সী এবং টিকা না পাওয়া শিশু।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা এই সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ অঞ্চলে চিকিৎসা ও টিকাদানের সুযোগ সীমিত থাকায় বহু ঘটনা হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ টিকাদানের সাফল্যের জন্য একটি উদাহরণ বা ‘পোস্টার বয়’ হিসেবে প্রশংসিত ছিল।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের জনসংখ্যা ও সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ড. আয়েশা মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশে বেড়ে ওঠার সময়ে আমরা কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর গভীর আস্থা রেখেছি। স্থানীয় ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সচেতনতা তৈরির শক্তিশালী ইতিহাস ছিল এ দেশে, যা ঘরে ঘরে টিকাদান নিশ্চিত করেছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালেও বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজের টিকা পাওয়ার হার ছিল ৯৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ক্ষেত্রে তা ছিল ৯৩ শতাংশ। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর হামে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ এর মধ্যে। এটি একটি রোগ নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
কিন্তু এরপরই পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করে। টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য যোগাযোগ গবেষক এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের সাবেক কর্মকর্তা শাকিল ফয়েজউল্লাহ বলেন, হামের মতো ভাইরাস কোনো দয়া দেখায় না। নিয়মিত টিকাদান প্রক্রিয়ায় সামান্যতম বিচ্যুতি বা ফাঁক তৈরি হলেই এটি দ্রুত থাবা বসায়— বাংলাদেশে ঠিক সেটাই ঘটেছে।
কীভাবে তৈরি হলো এই সংকট?
বিশেষজ্ঞরা এই মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক জটিল সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণকে দায়ী করেছেন, যাকে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারি বিশেষজ্ঞ ড. উইলিয়াম মস একটি ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ বা বহুমুখী সংকটের সম্মিলিত ফল বলে বর্ণনা করেছেন।
প্রতিবেদনে উঠে আসা প্রধান কারণগুলো হলো—
১. মহামারির ধাক্কা: ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে সারাদেশেই শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে প্রথম বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে।
২. সংগ্রহ বা প্রকিউরমেন্ট নীতিতে পরিবর্তন: ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর ওষুধ ও টিকা ক্রয়ে বহুদিনের পুরোনো প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে টিকার মজুত হঠাৎ কমে যায়।
৩. রাজনৈতিক অস্থিরতা: ওই সময়ে দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পরিকল্পিত সম্পূরক হাম টিকাদান কর্মসূচিগুলো পিছিয়ে যায়।
৪. বৈদেশিক সাহায্য হ্রাস: মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএস এইডের তহবিল কাটছাঁটের কারণে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) বজায় রাখা ব্যাহত হয়।
এর ফলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে হামের টিকাদানের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় চার লাখ শিশু হামের জন্য প্রয়োজনীয় সবকটি ডোজ থেকে বঞ্চিত হয় এবং অন্তত ৭০ হাজার শিশু একটি টিকাও পায়নি।
ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চল, শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি এবং বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয়ে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। রোগীকে মূলত উপসর্গভিত্তিক ও সহায়ক চিকিৎসা (সাপোর্টিভ কেয়ার) দেওয়া হয়। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যান্ডেমিক সেন্টারের পরিচালক ড. জেনিফার নুজো বলেন, হামের সাধারণ লক্ষণ লালচে র্যাশ ও জ্বরের মতো হলেও এটি নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রদাহের (এনকেফালাইটিস) মতো জীবনঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে।
হামের সংক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো অন্তত ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকাদানের আওতায় আনা, যাকে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা যৌথ বা সামাজিকভাবে অর্জিত প্রতিরোধ ক্ষমতা বলা হয়। ডব্লিউএইচও’র মতে, পরিপূরক দুই ডোজ টিকা নিলে শরীর দ্রুত রোগপ্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি করে।
আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকায় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সরকার প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে একটি বৃহৎ জরুরি টিকাদান অভিযান শুরু করে। এর ফলে সংক্রমণের গতি কিছুটা মন্থর হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. উইলিয়াম মস সতর্ক করে বলেন, জাতীয় পর্যায়ের টিকাদানের গড় হার অনেক সময় আসল চিত্র ঢেকে রাখে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা গোষ্ঠীর মধ্যে যদি টিকা না নেওয়া শিশু বেশি থাকে, তবে সেই ছোট পকেটগুলো থেকেই আবারও বড় মহামারির দাবানল ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বর্তমানে কেবল বাংলাদেশ নয়; যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মতো উন্নত দেশগুলোতেও হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যে তিন হাজার ২৯৪ জন হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং পেনসিলভানিয়ায় সম্প্রতি চতুর্থ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের এই ঘাটতির কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
শাকিল ফয়েজউল্লাহ জানান, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি মূলত সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়া এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাময়িক ব্যাঘাত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে টিকার সহজলভ্যতা থাকা সত্ত্বেও টিকাবিরোধী মনোভাব (অ্যান্টি-ভ্যাক্স) বা টিকা নিতে অনিচ্ছাই প্রধান কারণ।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জেনিফার নুজোও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যে কেউ চাইলেই টিকা পেতে পারে। বাংলাদেশে যা ঘটছে তা কোনোভাবেই টিকাবিরোধী মানসিকতার ফল নয়, বরং ব্যবস্থার ত্রুটি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে এই সংকটের মূল শিক্ষা হলো টিকাদান কর্মসূচিকে যেকোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক লক্ষ্যভিত্তিক টিকাদান জোরদার না করলে এই ধরনের ভাইরাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।
এফএ