নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪০ এএম
ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের সময়মতো ক্যানসার শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া গেলে অনেকেই সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে আর্থিক অসচ্ছলতা, চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার চাপের কারণে অনেক শিশুর পরিবার সংকটে পড়ে বলেও জানান তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ অবস্থায় ক্যানসার প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডির সেবা ভবনে ‘সেমিনার অন চাইল্ডহুড ক্যানসার: সচেতনতা, সেবা ও আশা’ শীর্ষক এ সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। শৈশব ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে আশিক, ফাউন্ডেশন ফর চাইল্ডহুড ক্যানসার এবং ওয়ার্ল্ড চাইল্ড ক্যানসার (ডব্লিউসিসি) যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বিশ্বে প্রতি মিনিটে গড়ে ৪ জন শিশুর ক্যানসার শনাক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশেও শিশু ক্যানসার রোগী বাড়ছে। ক্যানসারে আক্রান্ত একটি শিশুর সঙ্গে লড়াই করে পুরো পরিবার।
তারা আরও বলেন, দীর্ঘদিনের চিকিৎসা, খরচ জোগানো, মানসিক চাপ আর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করতে হয় পরিবারকে। তাই শুধু চিকিৎসা নয়, আক্রান্ত শিশু ও তার পরিবারের জন্য আবাসন, পুষ্টি, মানসিক সহায়তা, শিক্ষা ও প্যালিয়েটিভ কেয়ার নিশ্চিত করাও জরুরি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আশিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক (প্রোগ্রাম অপারেশনস) মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ।
তিনি জানান, প্রয়াত সালমা চৌধুরী ও আফজল হোসেন চৌধুরীর ছেলে আশিক হোসেন চৌধুরী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৩ সালে মারা যান। সন্তানের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে পরিণত করে সালমা চৌধুরী ১৯৯৪ সালে আশিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। তিন দশকের বেশি সময়ে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে হাজার হাজার ক্যানসার আক্রান্ত শিশু ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে।
মূল বক্তব্য দেন আশিক প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. সোনিয়া খানম আনী।
অনলাইনে আলোচনায় অংশ নিয়ে আশিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতার কন্যা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহীন হামিদ বলেন, আশিক ফাউন্ডেশনের রয়েছে আশিক শেল্টার, প্লে-সেন্টার, সাপোর্ট-এ-লাইফ, প্যালিয়েটিভ কেয়ার ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসসহ বিভিন্ন কার্যক্রম। ২০০০ সালে ২০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা আশিক শেল্টার বর্তমানে ঢাকার বাইরে থেকে চিকিৎসার জন্য আসা শিশু ক্যানসার রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করছে। আর্থিক সংকটের কারণে কোনো শিশুর চিকিৎসা যেন বন্ধ না হয়, সে লক্ষ্যে ২০০৪ সাল থেকে সাপোর্ট-এ-লাইফ কর্মসূচির মাধ্যমে অসচ্ছল পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
শিশুদের চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। ক্যানসারজয়ী শিশুদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখতে চালু করা হয়েছে ‘সারভাইভরস এডুকেশন সাপোর্ট প্রোগ্রাম’। তিনি ক্যানসার সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথি লায়ন সামিউল মুক্তাদির বলেন, শিশু ক্যানসার মোকাবিলায় সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল আশিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে ক্যানসার নিয়ে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকবে।
শিশু ক্যানসারের লক্ষণ, উপসর্গ ও করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন ইসলামিয়া আই হসপিটালের পরিচালক (কমিউনিটি সার্ভিস) গাজী মো. নজরুল ইসলাম ফয়সাল। বক্তব্য দেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা কামরুল জাহিদ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. চৌধুরী ইয়াকুব জামাল। ক্যানসারজয়ী রায়হান মিয়া তুলে ধরেন তার জীবনযুদ্ধের অভিজ্ঞতা।
সেমিনারে সাবেক সচিব বদিউর রহমান, মো. ফারুক হোসাইন, নাঈম খানসহ অন্যরা বক্তব্য দেন। এ সময় আশিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সালমা চৌধুরীর ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সাবেক সচিব, সাবেক পিকেএসএফ চেয়ারম্যান ও সাবেক ঢাকা জেলা প্রশাসক বদিউর রহমান বলেন, কোনো শিশু যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং কোনো পরিবার যেন এই কঠিন যাত্রায় একা না থাকে— এ লক্ষ্য সামনে রেখে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অনুষ্ঠানের সভাপতি আশিক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আসিফ হুসাইন চৌধুরী উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
এসএইচ/এএম