নিজস্ব প্রতিবেদক
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩২ পিএম
সংক্রামক রোগ হাম দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো শিশুমৃত্যু থামছে না। বরং প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা, যা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিবেদন বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে খুলনা, কুমিল্লা ও মৌলভীবার জেলায় তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত সাড়ে পাঁচ মাসে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯৪ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০০ জন এবং হামের উপসর্গে ৮৯৪ জন।
এর বাইরে গত ১৫ মার্চের পর থেকে এখন পর্যন্ত এক লাখ ৬৪ হাজারেরও বেশি শিশু হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে। এমনকি এই বছর বিভিন্ন স্থানে হামে প্রাপ্ত বয়স্কদেরও আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন: হাম উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু
অথচ গত এপ্রিলে টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যেই দেশে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হয়ে যাবে এবং হাম পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বাস্তবে সেটি ঘটেনি। ফলে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে, হার্ড ইমিউনিটি তৈরির জন্য যত শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল, সরকার সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।’ এছাড়া অব্যবস্থাপনার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা এখনো বাড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
হাসপাতালের পরিস্থিতি কী?
বেশ কিছুদিন ধরেই তীব্র জ্বরে ভুগছে ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা মোজাম্মেল হকের সাত মাস বয়সি মেয়ে। শুরুতে স্বাভাবিক জ্বর ভাবলেও দুই দিন আগে মেয়ের সারা শরীরে র্যাশ বের হতে দেখেন তারা। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে ভেবে দ্রুত তাকে ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
মোজাম্মেল হকের বলেন, ‘হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার দেখে বলছে, ডেঙ্গু না; ওর হাম হইছে।’
দেশে গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে শিশুদের মধ্যে মহামারি আকারে হাম ছড়িয়ে পড়ার পর সাড়ে পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রতিদিনই বাড়ছে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা।
ইতোমধ্যেই হাম উপসর্গে আক্রান্তের শিশুর সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে কেবল গত একদিনেই সারা দেশে হামের উপসর্গ ধরা পড়েছে এক হাজারেরও বেশি শিশুর মধ্যে।
মৃত্যুর সংখ্যা ও হাজার ছুঁই ছুঁই করছে। এর মধ্যে অন্তত একশ শিশুর মৃত্যু যে হামে হয়েছে, সেটি নিশ্চিত হয়েছেন চিকিৎসকরা। বাকিরা হাম উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে জানানো হয়েছে।
হাম ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সারাদেশ থেকে আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে ঢাকার শেরে বাংলা এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে আসছেন বাবা-মায়েরা। স্থান সংকুলান না হওয়ায় একপর্যায়ে হাসপাতালের বেডের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ায় কর্তৃপক্ষ।
গত এপ্রিলে টিকা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর জুন-জুলাই মাসে রোগির সংখ্যা অনেকটাই কমে আসতে থাকে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আবার রোগির সংখ্যা কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আতিকুল ইসলাম।

টিকা কাভারেজ নিয়ে প্রশ্ন
সারাদেশে মহামারি আকারে হাম ছড়িয়ে পড়ার সপ্তাহ তিনেকের মাথায় জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় টিকা কার্যক্রম শুরু করে সরকার। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের গণহারে টিকা দেওয়া হয়, যা চলে ২০ মে পর্যন্ত।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তখন আশা প্রকাশ করেছিলেন, জুলাই মাস সারাদেশে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ বলয় বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হয়ে যাবে এবং হাম পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই টিকার কাভারেজ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে দেখা যাচ্ছে।
কর্মসূচি শুরুর সময় সারাদেশে অন্তত এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, গত এপ্রিল ও মে মাসের ক্যাম্পেইনে প্রায় এক কোটি ৯৬ লাখ ৬১ হাজারেরও বেশি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ টিকার কাভারেজ শতভাগেরও বেশি বলে দাবি করছেন কর্মকর্তারা।
যদিও শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনার দাবির বিষয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ পোষণ করে আসছিলেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। তাদের সেই সন্দেহ পোক্ত হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরেকটি ক্যাম্পেইনের তথ্যে।
হামের টিকার পর ওই একই বয়সি শিশুদেরকে গত জুনে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পাওয়া শিশুর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখের মতো।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন, ‘এমন যে ঘটতে পারে তা আগেই অনুমান করা যাচ্ছিলে। কারণ হামের টিকার কর্মসূচি সরকার শুরু করেছিল পরিসংখ্যান ব্যুরোর পুরনো ডেটার ভিত্তিতে। কিন্তু তাদের হিসাব ঠিক কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু ইমার্জেন্সির ক্ষেত্রে তখন শুরু করাটা ঠিকই ছিল। তবে পরে সরকারের উচিৎ ছিল তৃণমূলের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমের সারাদেশে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে শিশুদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা।’
বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হলেও সরকার সেটি আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা মাইক্রো প্লানিংয়ের কথা বলে আসছি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং টিকার বিষয়ে অভিভাবকদের উৎসাহ না দেওয়া হলে শতভাগ কাভারেজ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু সরকার এতে পাত্তাই দেয়নি।’

অব্যবস্থাপনায় বাড়ছে মৃত্যু
হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যাদের চিকিৎসা যথাসময়ে শুরু করা যাচ্ছে না, তাদের মধ্যেই মৃত্যুর হার বেশি বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিশেষ করে, যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসতেছে, তাদের মধ্যে অনেক সময় কমপ্লিকেশন বেশি দেখা যাচ্ছে। এর মধ্য থেকে কিছু কিছু রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে মারা যাচ্ছে।’
চলমান হাম পরিস্থিতির জন্য শুরু থেকেই বিগত আওয়ামী লীগ এবং অর্ন্তবর্তী সরকারকে দায়ী করে আসছে বিএনপি সরকার।
কিন্তু প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে ভূমিকা না থাকলেও হাম ছড়িয়ে পড়ার পর সাড়ে পাঁচ মাসেও সেটি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারা এবং এর ফলে যত প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, সেটার জন্য বর্তমান সরকারের দায় রয়েছে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন: হাম কেন হয়?
বিশেষ করে, হাম ঘিরে শুরুতে জরুরি অবস্থা জারি না করা এবং জেলা পর্যায়ে হামের ভালো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পারার কারণে মৃত্যু বেড়েছে বলে মনে করেন তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছিলাম যে, এটা মহামারি ঘোষণা করে দেওয়া বা একটা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা দরকার। সেটা করলে সর্বাত্মক একটা ব্যবস্থা নেওয়া যেত সবগুলো ফ্রন্ট থেকে। আর সবগুলো ফ্রন্ট থেকে যদি হামের বিরুদ্ধে একসঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করা যেত, তাহলে হাম এত দীর্ঘায়িত হতো না।’

সরকার কী বলছে?
হামের টিকার ক্ষেত্রে শতভাগ কাভারেজের দাবি করলেও হার্ড ইমিউনিটি তৈরি না হওয়ায় এখন সরকারও মানছে যে, টিকা কার্যক্রম পুরোপুরি সফল হয়নি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নিজেও সেটা স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, ‘২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দীর্ঘদিন নিয়মিত হামের টিকা ক্যাম্পেইন না হওয়ায় দেশে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বেড়ে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। ক্যাম্পেইনের পরও নতুন করে টিকাদানের উপযুক্ত হওয়া শিশুদের একটি অংশ এবং সচেতনতার অভাবে সময়মতো টিকা না পাওয়া শিশুরা টিকাবঞ্চিত থেকে গেছে। ফলে তাদের মধ্যে হাম ছড়াচ্ছে।’
এ অবস্থায় বাদ পড়া শিশুদেরকে টিকার আওতায় আনার প্রচেষ্টা চলছে বলে জানান মন্ত্রী।
এদিকে ছয় মাসের কম এবং পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুদের মধ্যেও হামের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সে জন্য তাদেরকেও টিকার আওতায় আনা যায় কি না, সেটির বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা।
সেইসঙ্গে হাম আক্রান্ত শিশুরা যাতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ভালো সেবা পায়, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএইচ