নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৮ পিএম
স্বাস্থ্যখাতে কেনাকাটায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আমলে নিয়ে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে স্বাস্থ্যখাতে সব ধরনের টেন্ডার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
জানা গেছে, ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (নিমিউ অ্যান্ড টিসি) টেন্ডার মূল্যায়নে একই ব্যক্তি একাধিক কমিটিতে বারবার থাকা এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক, সিএমএসডি এবং নিমিউসহ সংশ্লিষ্ট অধীনস্থ সংস্থার প্রধানরা এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেন। বৈঠকে বর্তমান টেন্ডার প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১৪ আগস্ট পর্যন্ত স্থগিতাদেশ
মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে রিপোর্ট পেশ করার জন্য আগামী ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সব ধরনের টেন্ডার কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের পরই পুনরায় টেন্ডার কার্যক্রম চালু করবে সরকার।
ঠিকাদারদের অভিযোগ ও সিন্ডিকেট চক্র
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার জানান, নিমিউ’র প্রতিনিধিরাই সাধারণত সব জায়গার টেন্ডারের টেকনিক্যাল ইভালুয়েশন বা কারিগরি মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকেন। অন্যান্যরা কারিগরি বিশেষজ্ঞ না হওয়ায় নিমিউ’র প্রতিনিধিদের মতামতের ওপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করে।
তিনি অভিযোগ করেন, গত ৬-৭ বছর ধরে গুটিকয়েক ব্যক্তি নিমিউতে বহাল থাকায় তারাই ঘুরেফিরে বিভিন্ন হাসপাতালের টেন্ডার মূল্যায়ন করছেন। এর ফলে অসদুপায়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অতীতে এই কমিটিগুলোতে বুয়েটের প্রতিনিধি থাকার সুবাদে স্বচ্ছতা বজায় থাকত, কারণ শিক্ষকরা তুলনামূলক সৎ এবং সেখানে ঘুরেফিরে একই ব্যক্তির আসার সুযোগ ছিল না।
সিএমএসডি ইতোমধ্যে ২০২৫ সাল থেকে তাদের টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটিতে নিমিউ’র পরিবর্তে বুয়েটের প্রতিনিধি রাখা শুরু করেছে। ঠিকাদারদের দাবি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য খাতের সব জায়গায় নিমিউকে বাদ দিয়ে বুয়েটের প্রতিনিধি রাখা উচিত।
নিমিউ অ্যান্ড টিসি’র ওয়েবসাইট অনুযায়ী বর্তমানে সেখানে ১৬ জন কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। ঠিকাদারদের অভিযোগ, শুধু প্রধান পদটি পরিবর্তিত হলেও বাকিরা বিগত ৬ থেকে ৭ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে বহাল থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার মূল্যায়নে যুক্ত রয়েছেন।
এ বিষয়ে নিমিউ অ্যান্ড টিসি’র চিফ টেকনিক্যাল ম্যানেজার (উপসচিব) জয়ন্ত কুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন না বিধায় বিষয়টি তার জানা নেই। তবে একই ব্যক্তি একাধিক কমিটিতে থাকার বিষয়ে তিনি জানান, পর্যাপ্ত জনবল সংকটের কারণে (তার দপ্তরে মাত্র ৫ জন কর্মকর্তা থাকায়) বাধ্য হয়েই একই ব্যক্তিকে একাধিক কমিটিতে রাখতে হচ্ছে, যা পুরোপুরি নিয়মসম্মত নয়।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রণালয় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে এবং টেন্ডার নীতিমালাসহ পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা অনিয়মের বিষয়ে জানতে পেরেছি। বিগত সরকারের আমলে স্বাস্থ্য খাতে যে দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল এবং ব্যাপক লুটপাট হয়েছে, বর্তমান সরকার সেই ব্যবস্থা থেকে স্বাস্থ্য খাতকে বের করে আনতে চায়। তবে এই পরিবর্তন রাতারাতি করা সম্ভব নয়, কারণ বিভিন্ন জায়গায় পুরনো মানুষ ও সিস্টেম রয়ে গেছে। রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে কিছু পরিবর্তন এনে আমরা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।’
এসএইচ/এমআর