নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম
দেশের হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উচ্চ ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। আইসিডিডিআর,বির সাম্প্রতিক দুই গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তির সময় এসব ব্যাকটেরিয়ামুক্ত থাকা রোগীদের অর্ধেকেরও বেশি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরবর্তীতে এ ধরনের ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত বা সংক্রমিত হয়েছেন। এই সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুহার ৯০ শতাংশেরও বেশি।
গবেষকেরা বলছেন, হাসপাতালেই এসব ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ঠেকাতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
শনিবার (২৫ জুলাই) প্রতিষ্ঠানটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমন তথ্য জনানো হয়।
আইসিডিডিআর,বির গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণা দুটি আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম’ এবং ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল’-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় ঢাকার একটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৩৭৩ জন গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগী এবং একই হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি থাকা ৩৬৩ জন নবজাতকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট চারটি প্রধান গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া—ইশেরিশিয়া কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি, অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি এবং সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা—পরীক্ষা করা হয়। এসব ব্যাকটেরিয়া বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠলে সংক্রমণের চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে এগুলো নিউমোনিয়া, রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ, মূত্রনালির সংক্রমণ ও ক্ষতের সংক্রমণের মতো গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে।
আইসিইউর প্রায় অর্ধেক রোগীর (৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ) অন্ত্রে চিকিৎসা করা কঠিন এমন ওষুধ-প্রতিরোধী গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শরীরে রোগের লক্ষণ না থাকলেও ব্যাকটেরিয়া বহন করার এই অবস্থাকে কলোনাইজেশন বলা হয়। তবে এ ধরনের রোগীদের নিজের সংক্রমিত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি থাকে।
গবেষণায় শুরুতে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ামুক্ত থাকা ১৯৮ জন রোগীর মধ্যে ১০৫ জন, অর্থাৎ ৫৩ শতাংশ, আইসিইউতে অবস্থানকালে পরবর্তীতে ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হন। গবেষকদের মতে, এ তথ্য আইসিইউতে এসব জীবাণুর ব্যাপক বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কালচার পরীক্ষায় এসব ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া রোগীদের ৯০ শতাংশেরও বেশি মারা গেছেন। গবেষকেরা বলছেন, সীমিত চিকিৎসা সুবিধা, অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণের ঝুঁকি এই অস্বাভাবিক উচ্চ মৃত্যুহারের অন্যতম কারণ হতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও আইসিডিডিআর,বির সহকারী বিজ্ঞানী ড. গাজী মো. সালাহউদ্দীন মামুন বলেন, রোগীদের আইসিইউতে অবস্থানের পুরো সময় পর্যবেক্ষণ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে গবেষকেরা দেখেছেন কীভাবে হাসপাতালে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং কীভাবে শরীরে আগে থেকে থাকা ব্যাকটেরিয়া পরবর্তীতে প্রাণঘাতী সংক্রমণে রূপ নেয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কিছু রোগীর শরীরে শুরুতে নীরব বা সুপ্ত অবস্থায় থাকা ব্যাকটেরিয়াই পরবর্তীতে চূড়ান্ত সংক্রমণের কারণ হয়েছে। অর্থাৎ, শরীরে নীরবে বহন করা এসব জীবাণু সময়ের সঙ্গে মারাত্মক সংক্রমণে রূপ নিতে পারে।
আইসিডিডিআর,বির এএমআর রিসার্চ ইউনিটের প্রধান ও গবেষণার প্রধান গবেষক ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, হাসপাতাল আরোগ্যের জায়গা হওয়া উচিত, চিকিৎসা নিতে এসে নতুন প্রাণঘাতী সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার জায়গা নয়। রোগীদের সুরক্ষায় সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার জোরদার করা জরুরি।
তবে একই গবেষণা দলের দ্বিতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, শক্তিশালী সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে পারে।
ঢাকার একটি এনআইসিইউতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের হাত পরিষ্কার রাখা, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সাত মাসের এই কর্মসূচির পর প্রতি ১০০ জন ভর্তি রোগীর বিপরীতে রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ ২৮ জন থেকে কমে ৪ জনে নেমে আসে। অর্থাৎ সংক্রমণ কমে ৮৬ শতাংশ। একই সময়ে মৃত্যুহারও প্রতি ১০০ জনে ২৬ জন থেকে কমে ৪ জনে নেমে আসে।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীরা সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন, যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। তবে গবেষণা একই সঙ্গে দেখিয়েছে, মৌলিক সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করলে সংক্রমণ ও মৃত্যু বহুগুণ কমানো সম্ভব।
গবেষকদের মতে, হাত ধোয়া, হাসপাতাল ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার, নিয়মিত নজরদারি এবং নিরাপদ রোগীসেবা নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ জোরদার করলেই এসব প্রাণঘাতী সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এমএইচ/এএইচ