নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ জুন ২০২৬, ১১:৫৩ পিএম
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতি তিনজন কিশোরীর মধ্যে দুইজন মাসিক-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে। অনেক ক্ষেত্রে এ সমস্যা এতটাই তীব্র যে তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি স্কুলেও অনুপস্থিত থাকতে হচ্ছে। একই সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) বিষয়ে জ্ঞানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ঢাকার কানাডা ক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত অ্যাডসার্চ গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণাটি আইসিডিডিআর,বির বালিয়াকান্দি হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের (এইচডিএসএস) আওতায় ২ হাজার ৭১৩ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর ২৪ মাস ধরে পরিচালিত হয়। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি চার মাস অন্তর অংশগ্রহণকারীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: অনলাইনে ঘরে বসেই যেসব স্বাস্থ্য সেবা পাবেন
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১ হাজার ২৫৫ জন কিশোরীর মধ্যে ৬৪ শতাংশ অন্তত একটি মাসিক-সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা বা ডিসমেনোরিয়া, যা ৫৬ শতাংশ কিশোরীর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতি তিনজন কিশোরীর মধ্যে একজন গবেষণাকালীন সময়ে অন্তত তিনবার বা তার বেশি তীব্র মাসিক ব্যথার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে ৯ শতাংশ কিশোরী নিয়মিতভাবে এ সমস্যায় ভুগেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ কিশোরী জানিয়েছে, মাসিকের ব্যথার কারণে তাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। প্রতি চারজনের মধ্যে প্রায় একজন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা তীব্র ব্যথার কারণে স্কুলে যেতে পারেনি। নিয়মিত মাসিকজনিত ব্যথায় আক্রান্ত মেয়েদের ৪৩ শতাংশের মধ্যে অন্য শারীরিক জটিলতাও দেখা গেছে।
প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে জ্ঞানের ঘাটতি
বালিয়াকান্দি ও রাজবাড়ী এলাকার ১ হাজার ৭৭ জন ১৬ বছর বয়সী অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীর ওপর পরিচালিত পৃথক এক বিশ্লেষণে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ৩৪ শতাংশ কিশোর জানে না যে ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর মেয়েরা গর্ভধারণ করতে পারে। কিশোরীদের ক্ষেত্রে এ হার ১৬ শতাংশ।
জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কেও কিশোর-কিশোরীদের জ্ঞানে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। যেখানে ৮৪ শতাংশ কিশোর কনডম সম্পর্কে জানে, সেখানে মাত্র ৪৫ শতাংশ কিশোরী এ বিষয়ে অবগত। একইভাবে জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সম্পর্কে ৩৮ শতাংশ কিশোরের ধারণা থাকলেও কিশোরীদের মধ্যে এ হার মাত্র ৪ শতাংশ।
বিয়ের আগেই তথ্য পেলে কমে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বিয়ের আগে পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে জ্ঞান থাকা মেয়েদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
যেসব কিশোরী বিয়ের আগে পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানত, তাদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার ছিল ৫ শতাংশ। বিপরীতে এ বিষয়ে জ্ঞান না থাকা মেয়েদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১০ শতাংশ।
পর্যবেক্ষণকালীন সময়ে প্রায় ২০০ জন কিশোরীর বিয়ে হয় এবং ৭২ জন গর্ভবতী হয়। গবেষকেরা বলছেন, এ তথ্য বিয়ের আগেই সঠিক প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
‘কৈশোর কথা’ অ্যাপসহ দুই উদ্ভাবনী উদ্যোগ
সেমিনারে কিশোর-কিশোরীদের জন্য নির্ভরযোগ্য প্রজনন স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সুস্থতাবিষয়ক তথ্য সহজলভ্য করতে অ্যাডসার্চের দুটি উদ্ভাবনী উদ্যোগও তুলে ধরা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে চাঁদপুরের মতলবে পরিচালিত স্মার্টফোনভিত্তিক একটি শিক্ষা প্রকল্প, যা ৮৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। এ ছাড়া ‘কৈশোর কথা’ নামে একটি বিনা মূল্যের বাংলা মোবাইল অ্যাপ উপস্থাপন করা হয়, যেখানে অ্যানিমেটেড ভিডিও, ইনফোগ্রাফিকস এবং বিভিন্ন ভুল ধারণার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
মাসিক নিয়ে কুসংস্কার দূর করার আহ্বান
আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী ড. ফাওজিয়া আখতার হুদার সঞ্চালনায় আয়োজিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি ডা. ফারহানা দেওয়ান, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকারবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মো. নুরুদ্দীন, বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটির কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর নন্দিনী লোপা, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এমসিএইচ সার্ভিস ইউনিটের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মনজুর হোসেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্কুল হেলথ শাখার সহকারী পরিচালক ডা. আসিফ ইকবাল।
আলোচনায় ডা. ফারহানা দেওয়ান মাসিক নিয়ে সমাজে প্রচলিত লোকলজ্জা ও কুসংস্কার দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, বিশেষ করে গ্রামীণ কিশোরীদের ক্ষেত্রে।
সৈয়দ মো. নুরুদ্দীন স্কুলভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম, মেয়েদের শিক্ষা এবং কিশোর-কিশোরীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের ওপর জোর দেন।
ডা. মনজুর হোসেন বলেন, পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক তথ্য মেয়েদের কাছে বিয়ের আগেই পৌঁছে দিতে হবে। তিনি জানান, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর প্রাক্-বৈবাহিক কাউন্সেলিংকে কার্যক্রমের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।
অন্যদিকে ডা. আসিফ ইকবাল কিশোর-কিশোরীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকারবিষয়ক তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করার জন্য সরকারের চলমান উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
সেমিনারে বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (ডেভেলপমেন্ট-হেলথ) এডওয়ার্ড ক্যাব্রেরা বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার নিশ্চিত করতে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার অব্যাহত সহযোগিতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
গবেষকেরা বলছেন, গবেষণার ফলাফল কিশোর-কিশোরীদের জন্য মাসিককালীন সহায়তা, প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা এবং কিশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় আরও বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে, যাতে তারা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সুস্থ জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়।
এমএইচ/এআর