নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ জুন ২০২৬, ০৯:০৯ পিএম
স্বাস্থ্য খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় দ্বিগুণ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষ এর সুফল পাবে না বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক ও নীতিনির্ধারকরা।
তাদের মতে, বড় বাজেটের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ সঠিক খাতে ব্যয় করা এবং স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো দূর করা।
বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর বাংলামোটরে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) আয়োজিত বাজেটোত্তর ‘স্বাস্থ্য সাংবাদিক কর্মশালা’য় বক্তারা এসব কথা বলেন।
এনডিএফের দপ্তর সম্পাদক ডা. জিয়াউল হকের সঞ্চালনায় এবং সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. একেএম ওয়ালিউল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। এতে কি-নোট স্পিকার হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক। প্রধান আলোচক ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। এছাড়া বক্তব্য দেন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাদরুল আলম।
কি নোট উপস্থাপনায় অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, দ্রুত নগরায়ন ও মূল্যস্ফীতির কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চিকিৎসা ব্যয়ে বাংলাদেশের মানুষের নিজস্ব খরচ সবচেয়ে বেশি। থাইল্যান্ডে যেখানে ব্যক্তিগত ব্যয় ১০ শতাংশ, মালদ্বীপে ১৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা ৭৯ শতাংশ। এমনকি শ্রীলঙ্কা ও নেপালের তুলনায়ও বাংলাদেশের মানুষের নিজস্ব চিকিৎসা ব্যয় বেশি।
তিনি বলেন, প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার স্বাস্থ্য বাজেট কাগজে-কলমে বড় হলেও এর বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ জনবল নিয়োগের যে পরিকল্পনা রয়েছে, সেটি স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অতীতে বড় বাজেটের বড় অংশ অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে। এবারও যদি একই ধারা অনুসরণ করা হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।
রুমানা হক আরও বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতের বড় সমস্যা দক্ষতার ঘাটতি। কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত যারা বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে প্রাক-বাজেট ও সংশোধিত বাজেটের মধ্যে বড় ধরনের কাটছাঁটের প্রবণতার দিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বহু হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম অচল অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক হাসপাতালেই এক্স-রে বা অন্যান্য মৌলিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা কার্যকর নয়। ফলে রোগীদের অতিরিক্ত খরচ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে।
প্রধান আলোচক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, একটি বাজেটকে তখনই সফল বলা যায়, যখন তা বিদ্যমান ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে যথাযথভাবে অর্থ ব্যয় করা গেলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। তিনি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় অধিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, অনেক সময় কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ আটকে থাকে, অথচ প্রয়োজনীয় খাতে অর্থের অভাবে কাজ করা যায় না। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে বাস্তব চাহিদাভিত্তিক ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালগুলোকে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের সক্ষমতাও দিতে হবে।
ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাদরুল আলম বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ থেকে ৭ শতাংশ বা জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। স্বাধীনতার ৫৬ বছর পরও বাংলাদেশ সে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তবে বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা ইতিবাচক।
তিনি বলেন, চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রতি বছর প্রায় ২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন এবং প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের বাজেট ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় সংকট জনবল ঘাটতি। বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার জনবলের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, প্রতিবছর চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে থাকা যন্ত্রপাতি সচল রাখা গেলে রোগীদের এ ব্যয় অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ আরও বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ২৫ শতাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করা হচ্ছে, অথচ প্রত্যাশিত ফল পেতে হলে এ খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
কর্মশালায় এনডিএফের জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ, সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভসহ স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংবাদিক ও চিকিৎসক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এমএইচ/এআর