images

হেলথ

স্থূলতা ও ডায়াবেটিসে বাড়ছে ফ্যাটি লিভার, লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসায় জোর

নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ জুন ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম

বিশ্বব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দ্রুত বাড়ছে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এমএএফএলডি)। ভবিষ্যতে সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার ও লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশনের প্রয়োজনীয়তার বড় কারণ হয়ে ওঠা এই রোগ মোকাবিলায় লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্ক্রিনিং এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকালে গ্লোবাল ফ্যাটি লিভার দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) হেপাটোলজি বিভাগের উদ্যোগে ‘টার্গেটেড থেরাপি ইন মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এমএএফএলডি)’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক সেমিনার এসব তথ্য জানানো হয়।

সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হেপাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম এলিন। তিনি বলেন, স্থূলতা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের হার বৃদ্ধির কারণে উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশেই এমএএফএলডির প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে এটি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং গুরুতর লিভার জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

তিনি জানান, এমএএফএলডি হলো লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে যাওয়ার একটি অবস্থা, যা মূলত টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও বিপাকীয় প্রক্রিয়ার ত্রুটির সঙ্গে সম্পর্কিত। আগে এটি নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এনএএফএলডি) নামে পরিচিত ছিল।

ডা. এলিন বলেন, যথাযথ চিকিৎসা না হলে এমএএফএলডি ধীরে ধীরে লিভারের প্রদাহ, ফাইব্রোসিস, সিরোসিস এবং হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা বা লিভার ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। ফলে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং কার্যকর চিকিৎসা কৌশল গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ওজন কমানো, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়ামই ছিল এই রোগের চিকিৎসার মূল ভিত্তি। তবে বর্তমানে গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এমএএফএলডি একাধিক জৈবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত এবং রোগীভেদে এর কারণ ও অগ্রগতির ধরণ ভিন্ন। এ কারণে লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির গুরুত্ব বাড়ছে।

মূল প্রবন্ধে তিনি ‘GLP-1 Receptor Agonist’, ‘SGLT2 Inhibitor’, ‘THR-β Agonist’, ‘FGF21 Analogue’ এবং ‘FXR Agonist’-সহ উদীয়মান টার্গেটেড থেরাপির সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তার মতে, রোগের অন্তর্নিহিত বিপাকীয় ও আণবিক কারণগুলো চিহ্নিত করে রোগীভিত্তিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা প্রদান সম্ভব হলে লিভার রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের মাধ্যমে ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এ ধরনের বৈজ্ঞানিক আয়োজন চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বক্তারা বলেন, বর্তমানে এমএএফএলডি বিশ্বব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগের অন্যতম প্রধান কারণ এবং এটি ভবিষ্যতে সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার ও লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশনের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এ কারণে রোগটি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্ক্রিনিং এবং সময়োপযোগী চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

তারা আরও বলেন, ফ্যাটি লিভার রোগ বর্তমানে একটি ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে বিস্তার লাভ করছে। তাই একে জনস্বাস্থ্যের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তারা এমএএফএলডি মোকাবিলায় চিকিৎসক, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহিনুল আলমের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন— বিএমইউর উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামাল এবং প্রক্টর অধ্যাপক ডা. শেখ ফরহাদ প্রমুখ।

এমএইচ/এএস