নিজস্ব প্রতিবেদক
০৪ জুন ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম
দেশের স্বাস্থ্যখাতে বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে উঠতে ধাপে ধাপে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যে সরকার এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের আয়োজনে ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বাজেট সংলাপ: অগ্রাধিকার, ঘাটতি ও করণীয়’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. তিতুমীর বলেন, দেশের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতে অবকাঠামো ও জনবলের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কোথাও অবকাঠামো থাকলেও জনবল নেই, আবার কোথাও জনবল থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দেশে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তবে প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দিয়েছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, বিভিন্ন গবেষণা ও সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যখাতের অনেক সমস্যার সমাধান পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্ভব। এ কারণে সরকার ধারাবাহিকভাবে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবার একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে।
উপদেষ্টা জানান, আমারা কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকে যাচ্ছি। এজন্য আমরা শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার জন্য পরিপূর্ণ সেবার একটা রোডম্যাপ তৈরির দিকে এগোচ্ছি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় রোগী প্রথম সাধারণ চিকিৎসক, এরপর উপজেলা ও জেলায় যাবে। সেখানে করোনারি কেয়ার ইউনিট ও কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার বড় পরিসরে করা হবে। এটা ধাপে ধাপে উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যখাতে জনবল সংকট নিরসনে নতুন করে পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে ইউএপি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মুজিবুল হক বলেন, জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি। গবেষণা ও উদ্ভাবনভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
ইউএপির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, স্বাস্থ্যখাত একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল ভিত্তি। স্বাস্থ্য বাজেটকে আরও কার্যকর ও গবেষণাভিত্তিক করতে একাডেমিয়া, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক। তিনি দেশের স্বাস্থ্যখাতের অর্থায়ন কাঠামো, বাজেট বরাদ্দের বর্তমান অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
প্যানেল আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক সেবায় চলে যাচ্ছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যকর না থাকায় রোগীরা সরাসরি ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনছেন, ফলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ছে। তিনি সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো সক্রিয় করার পাশাপাশি প্রয়োজনে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের পরামর্শ দেন।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. লিয়াকত আলী বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসকের তুলনায় স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা অত্যন্ত কম উল্লেখ করে তিনি এ খাতে দ্রুত নিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ড. এম এইচ চৌধুরী লেলিন বলেন, দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশই বেসরকারি খাত প্রদান করছে। তাই স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বেসরকারি খাতকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি তাদের তদারকির জন্য আলাদা পরিদফতর গঠন প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. সেলিম রেজা বলেন, এসডিজি উত্তরণের পর দেশের ওষুধ শিল্প নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে কাঁচামাল উৎপাদনে নির্ভরশীলতা কমাতে এখন থেকেই নীতিগত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বক্তারা স্বাস্থ্যখাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং একাডেমিয়া, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান।
এমএইচ/এফএ