সাখাওয়াত হোসাইন
১৬ মে ২০২৬, ১০:১৩ এএম
# টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা হাম পরিস্থিতিকে জটিল করেছে
# ৯৫ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা জরুরি বলে মত বিশেষজ্ঞদের
# ভ্যাকসিনের সংকট নেই এবং বাদ পড়া শিশুরাও দ্রুত টিকা পাবে
# হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন ও ভেন্টিলেশন সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে
হামে আক্রান্ত হয়ে দেশজুড়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা কমছেই না। প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে কিংবা এর উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে। নতুন করে শত শত শিশু আক্রান্ত হচ্ছে ভাইরাসজনিত এই ছোঁয়াচে রোগে। এমন অবস্থায় দেশজুড়ে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত হামে ৪৫১ জন শিশু মারা গেছে। একই সঙ্গে হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা, তবে সংকট মোকাবিলায় নানা চ্যালেঞ্জের কথাও উঠে আসছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ৪৫১ শিশুর।
এই ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা ১১১ জন, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা সাত হাজার ৪১৬ জন। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৫ হাজার ৬১১ শিশুর। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪০ হাজার ১৭৬ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ৩৬ হাজার ৫৫ শিশু।
উদ্বেগে পুরো দেশ
হামজনিত শিশুমৃত্যু বাড়তে থাকায় অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ও কভারেজে ঘাটতি থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিগত সময়ে শিশুরা টিকা পায়নি, যার কারণে হামের এতো প্রাদুর্ভাব হয়েছে। বিগত সময়ে কেন শিশুরা পায়নি, এটা নিয়ে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। যে দাবিটা মিডিয়ায় বেশি করা হচ্ছে, টিকা কিনতে পারেনি। কথা কিন্তু তা নয়, টিকা আগে থেকে কেনা ছিল।’
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যখনই হামের প্রাদুর্ভাব হলো তখনই দু-চার দিনের মধ্যে টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। টিকা আলু-পটলের মতো নয়, চাইলেই কিনে ফেললাম, তা নয়। অর্ডার দেওয়ার পর টিকা তৈরি হয় এবং পরে পাঠায়। আর প্লেনে পাঠালেই দুই বা তিন সপ্তাহ সময় লাগে। এটা প্রমাণ হয় টিকা ছিল। টিকা থাকলে বাচ্চারা পেল না কেন? এটা হলো প্রশ্ন।’
টিকা বিতরণ ব্যবস্থায় দুর্বলতার অভিযোগ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মাঠপর্যায়ে টিকা পৌঁছাতে পরিবহন ও পরিচালন ব্যয়ের সমস্যা তৈরি হয়েছিল, যা কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর বলেন, ‘এখন টিকা ঢাকার মহাখালীতে থাকলে হবে না। সেই টিকা যেতে হবে উপজেলা পর্যন্ত। যাতায়াতের জন্য গাড়ির যে তেল খরচ, তেলের টাকা ছিল না। এখন তেলের টাকা কেন ছিল না? আগে টাকার সংস্থান হতো সেক্টর প্রোগ্রামের আওতায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে দেয়। বিকল্প কিছু না রাখায় গাড়ির তেলের টাকা ছিল না এবং গাড়ি চলেনি। সেইসঙ্গে টিকা উপজেলায় যায়নি।
‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে টিকা নিয়ে যায় টিকা কেন্দ্রে যায় ডেইলি ব্যাসিসের স্বাস্থ্যকর্মীরা। তাদের বেতনও আসতো সেক্টর প্রোগ্রামের আওতায়। যেহেতু প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে গেল, তারাও বেতন পেল না। তারা বেতন পায়নি জুলাই ২০২৪ সাল থেকে। তবুও তারা বেতন পাবে আশায় কাজ করেছে, কিন্তু যখন প্রোগ্রামই বন্ধ করে দিলো, তখন আর তাদের প্রত্যাশার জায়গাটা থাকলো না। তারা আর টিকা বহনের কাজ করেনি। আর যারা টিকা দেন স্বাস্থ্য সহকারী তাদের এক তৃতীয়াংশ পদ ফাঁকা রয়েছে এবং তাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাদের কিছু দাবি-দাওয়া রয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে তারা আন্দোলনও করেছে, যখন আন্দোলন হয়েছে তখন তো আর কাজ করেনি।’
৯৫ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা জরুরি জানিয়ে অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর বলেন, ‘আমাদের ইপিআইয়ের কাছে ঠিক মতো তথ্য নেই। ওরা যখন বলে ১০০ শতাংশ টিকা দেওয়া হয়েছে, তখনও প্রচুর বাচ্চা টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। নিয়মিত টিকার কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে। পথশিশুদেরকেও টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।’
মৃত্যুহার কমাতে দরকার সমন্বিত পদক্ষেপ
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘হাম প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে মনিটরিং কমিটি করা উচিত। কমিটির মাধ্যমে ডেথ রিভিউ করা দরকার। ডেথ রিভিউ নিয়ে নানা বিষয়ে আলোচনা করা দরকার। কোন বয়সে ডেথ হচ্ছে বেশি এবং কারা মারা যাচ্ছে। যেসব হাসপাতালে হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যেসব হাসপাতালে সবকিছু ঠিকমতো থাকতে হবে। ভেন্টিলেটর ও অক্সিজেন সবকিছু নিশ্চিত করতে হবে, যেন হাসপাতালে মৃত্যু বেশি না হয়।
আরও পড়ুন: কিট স্বল্পতা, জটিল হচ্ছে হাম পরিস্থিতি
‘অন্যদিকে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে। সেইসঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। আর যেন শিশুরা টিকা বঞ্চিত না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কত সালের মধ্যে হামমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জন করা যাবে, সেই অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে কাজ করতে হবে।’
বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনে শিশুমৃত্যু বেশি
বিশ্বে বর্তমানে দুটি দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশ দুটি হলো ফিলিস্তিন ও বাংলাদেশ। ফিলিস্তিনে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে, আর বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা না দেওয়ায় এই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায় রয়েছে। তখন টিকা দেওয়া বন্ধ হয়। তাদের সিদ্ধান্ত এবং উদ্যোগের অভাবের কারণেই টিকা দেওয়া হয়নি।’
মায়ের পুষ্টিহীনতায় প্রভাব পড়ছে শিশুদের স্বাস্থ্যে
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ চরম চাপে পড়েছে। অনেক পরিবারই এখন পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত কিনতে পারছে না। এর ফলে একদিকে যেমন মায়েদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশুদের স্বাস্থ্যে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে হামের মতো সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্যে বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর বলেন, ‘বাচ্চারা টিকা না পাওয়ায় হামে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। আরেকটি বিষয় হলো গত দুই বছর ধরে জিনিসপত্রের দাম প্রচুর বেড়েছে। আর স্বল্প আয়ের যেসব ব্যক্তিরা রয়েছেন, তাদের খরচ করার আয় সীমিত হয়ে গেছে। ফলে বাচ্চারা অপুষ্টিতে ভোগা শুরু করেছে এবং মায়েরাও অপুষ্টিতে ভুগছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হামের প্রথম টিকা দেওয়া হয় ৯ মাসে আর দ্বিতীয় টিকা দেওয়া হয় ১৫ মাসে। হামের টিকাটা জন্মের পর না দিয়ে ৯ মাস বয়সে দেওয়া হয় কেন? বাচ্চারা মায়ের বুক থেকে যে দুধ খাবে, সেই দুধ থেকে সুরক্ষা পাবে। এই সুরক্ষাটা নয় পর্যন্ত শিশুরা পাবে। এখন মায়েরা যখন অপুষ্টিতে ভোগা শুরু করলো, তখন মায়ের দুধ থেকে বাচ্চারা নিরাপত্তাটা আর পেল না। সবমিলিয়ে আজকের অবস্থা এসে দাঁড়িয়েছে।’
হাম প্রতিরোধে নতুন টিকাদান কর্মসূচি
হামের এমন ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে টিকাদান কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেয় বর্তমান সরকার। বর্তমানে দেশব্যাপী শিশুদের বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান দেওয়া হচ্ছে।
কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১ কোটি ৭২ লাখেরও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৯৮ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘যারা এখনো টিকা পায়নি, তাদেরকেও দ্রুত টিকা দেয়া হবে। দেশে ভ্যাকসিনের সংকট নেই। নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতায় শিশুদের হারাতে হচ্ছে। আমরা হামমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলব।’
প্রভাত চন্দ্র আরো বলেন, ‘হামের টিকার অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহ সময় লাগে। তাই টিকা গ্রহণের পরও কিছু সময় সতর্ক থাকতে হবে।’
এসএইচ/এমআর