images

হেলথ

স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোই বৈষম্য কমানোর উপায়: ওয়াহিদউদ্দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৭ মে ২০২৬, ০৭:৫৬ পিএম

স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত খরচ যত বাড়বে, সমাজে বৈষম্যও তত বাড়বে।  অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ানো গেলে নিম্নআয়ের মানুষ বেশি উপকৃত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাজধানীতে ‘বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অপূর্ণতা এবং ব্যক্তিগত ব্যয়ে চিকিৎসার গতিপ্রকৃতি পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এসব বলেন। আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সম্মেলন কক্ষে এ সেমিনারের আয়োজন হয়। 
  
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, স্বাস্থ্যসেবার অপূর্ণ চাহিদা শুধু অর্থনৈতিক কারণে নয়, সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও জড়িত। অনেক সময় মানুষ অসুস্থ হলেও চিকিৎসা নেয় না, আবার পরিবারে নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। স্বাস্থ্য সচেতনতার ঘাটতি এবং সামাজিক রক্ষণশীলতাও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
 
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, আগে বিআইডিএসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সিলেটে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো তুলনামূলক ভালো হলেও মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হার কম ছিল। বিপরীতে ফরিদপুরে সুযোগ-সুবিধা কম থাকলেও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ তুলনামূলক বেশি ছিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শুধু স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাও জরুরি।
 
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতার অভাবের কথাও তুলে ধরেন অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন । বলেন, স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন উভয় ক্ষেত্রেই দুর্বলতা রয়েছে। এমনকি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও বরাদ্দের অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করতে পারে না। মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের মধ্যে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক খরচের হার যত বেশি হবে, স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যও তত বাড়বে। কারণ সমাজে আয়ের বৈষম্যের তুলনায় স্বাস্থ্য খরচের বৈষম্য আরও বেশি প্রকট। এ কারণে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়। তবে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো উচ্চতর সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় তুলনামূলকভাবে বৈষম্য রয়ে গেছে। তারপরও সামগ্রিকভাবে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ানো বৈষম্য কমাতে সহায়ক। স্বাস্থ্যসেবায় প্রাইভেট সেক্টরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ‘আউট অব পকেট’ ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই দেশের মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় কাছাকাছি হলেও ভিয়েতনামে সরকারি ব্যয়ের অনুপাত বেশি থাকায় দেশটি স্বাস্থ্য সূচকে এগিয়ে গেছে।
 
স্বাস্থ্য খাতে নীতিনির্ধারকদের বড় ধরনের দ্বিধার কথাও উল্লেখ করেন অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন । বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় কোথায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। একদিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব, অন্যদিকে ডায়ালাইসিস, আইসিইউর মতো ব্যয়বহুল প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসাও জরুরি। কিন্তু সব চাহিদা একসঙ্গে পূরণ করা বাস্তবে সম্ভব নয়। অর্থনীতির ভাষায় এটিই ‘ট্রেড-অফ’। আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে সবাই বলতে পারে দুটোই করতে হবে। কিন্তু সীমিত সম্পদের কারণে সরকারকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতেই হয়। এটি অত্যন্ত কঠিন এবং সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত।

মধ্যবয়সীদের মধ্যে অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, বায়ুদূষণ, খাদ্য দূষণ ও নগরায়ণের কারণে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ বাড়ছে। এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয়ও তুলনামূলক অনেক বেশি।বাংলাদেশ একদিকে আধুনিকায়নের পথে এগোচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণের কারণে নতুন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে। ফলে স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপও বাড়ছে।
 
এর আগে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে নাগরিকের কী পরিমাণ অর্থ গুনতে হয় এবং অর্থ সংকটে সেবাগ্রহণ ব্যাহত হওয়া সম্পর্কিত একটি গবেষণা প্রবন্ধ সেখানে উপস্থাপন করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের রিসার্চ ফেলো ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। 
 
এএইচ/ক.ম