নিজস্ব প্রতিবেদক
০৭ মে ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশই চলে যাচ্ছে ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) বলছে, হাসপাতালে ভর্তিকালীন একজন রোগীর মোট চিকিৎসা ব্যয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ খরচ হয় ওষুধে এবং ১৭ শতাংশ ব্যয় হয় বিভিন্ন রোগ নির্ণয় পরীক্ষায়। ফলে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত খরচের চাপ ক্রমেই বাড়ছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য চিকিৎসা গ্রহণ আরো কঠিন হয়ে উঠছে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিআইডিএস’র জনসংখ্যা অধ্যয়ন বিভাগের ‘বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অপূর্ণতা এবং ব্যক্তিগত ব্যয়ে চিকিৎসার গতিপ্রকৃতি পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করবেন বিআইডিএস’র রিসার্চ ফেলো ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সূচকে উন্নতি হলেও চিকিৎসা ব্যয়ের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যক্তিগত খরচ এখনো সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। ২০২৪ সালে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের হার দাঁড়িয়েছে ৭৯ শতাংশ। অর্থের অভাবে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষ চিকিৎসা নিতে পারছেন না। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার অপূর্ণতা দেশের স্বাস্থ্যখাতে বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
গবেষণাটির উদ্দেশ্য ছিল প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার অপূর্ণতা, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের অবস্থা এবং অর্থায়নের প্রভাব বিশ্লেষণের মাধ্যমে বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা। এতে ২০২২ সালের গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। মোট ১৪ হাজার ৪০০টি পরিবার এবং ৬২ হাজার ৩৮৭ জন ব্যক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ মানুষ মাসে অন্তত একবার চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভব করেন। কিন্তু তাদের মধ্যে ১৫ শতাংশ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা নিতে পারেন না। যা মোট প্রয়োজনের ৬৫ শতাংশের সমান। গ্রামীণ এলাকায় এ সমস্যা আরো প্রকট। গ্রামে অপূর্ণ চিকিৎসা প্রয়োজনের হার ৬৮ শতাংশ, যেখানে শহরে তা ৫৯ শতাংশ।
জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার অপূর্ণতা দেখা গেছে নড়াইলে। এ জেলার ৮১ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে হবিগঞ্জ, যেখানে এ হার ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে কম প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার অপূর্ণতা দেখা গেছে ফেনী জেলায়, যেখানে এ হার ১৮ শতাংশ।
গবেষণায় চিকিৎসা ব্যয়ের খাতভিত্তিক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তিকালীন মোট ব্যয়ের ২৬ শতাংশ যায় ওষুধে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৩ শতাংশ ব্যয় হয় অস্ত্রোপচারে। এছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যয় হয় ১৭ শতাংশ, শয্যা ভাড়ায় ১৬ শতাংশ, অন্যান্য খাতে ৭ শতাংশ এবং যাতায়াতে ৬ শতাংশ। চিকিৎসকের পরামর্শ ফি বাবদ ব্যয় হয় মোট খরচের মাত্র ৫ শতাংশ।
এদিকে একটি পরিবার গড়ে প্রতি মাসে ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করে, যা মোট পারিবারিক ব্যয়ের ১১ শতাংশ। এই ব্যয়ের বড় অংশই ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চলে যাচ্ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় আরো বলা হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ তুলনামূলকভাবে সমভাবে বণ্টিত হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা গ্রহণ ধনী মানুষের মধ্যেই বেশি সীমাবদ্ধ। যদিও ধনীদের মোট ব্যয় বেশি, কিন্তু দরিদ্র মানুষের ওপর আর্থিক চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। দরিদ্র পরিবার তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ চিকিৎসায় ব্যয় করে, যেখানে ধনীদের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ৫ শতাংশ।
এএইচ/এফএ