images

হেলথ

হামের থাবায় নিভছে শিশুপ্রাণ, দিশেহারা বাবা-মা

সাখাওয়াত হোসাইন

২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৪ পিএম

• হামে আক্রান্ত ২৮ হাজার ছাড়ালো, মৃত্যুহার বাড়ায় উদ্বেগ
• সংক্রমণের থাবায় দিশেহারা শৈশব, করোনার চেয়েও ছড়াচ্ছে দ্রুত
• টিকার ঘাটতি আর অসচেতনতায় বাড়ছে মৃত্যু: চিকিৎসক
• হাসপাতালের করিডোরে বাবা-মায়ের হাহাকার

দেশে শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে হামের সংক্রমণ। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। একই সঙ্গে হাসপাতালে থামছে না মৃত্যুর মিছিল। এতে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে টিকাদানের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই সংক্রমণ বাড়ছে।

তাঁদের মতে, টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতিই হামের বিস্তারের প্রধান কারণ। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই থেকে অনেক শিশু বাদ পড়ে যাওয়ায় তাদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। এ ছাড়া ঘনবসতি ও অপুষ্টির কারণেও ভাইরাস দ্রুত ছড়াচ্ছে। টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ ডোজ নেওয়ায় একটি বড় জনগোষ্ঠী ঝুঁকিতে রয়েছে।

হামে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ বছরের শিশু তানভীর হাসান। হাসপাতালের ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা হয় শিশুটির পিতা রাকিব আহমেদের সঙ্গে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে খাওয়া-দাওয়া সব বন্ধ শিশুর। দুই দিন হলো কথা-বার্তাও কমে গেছে। কত চঞ্চল ছিল আমার বাবা। এখন বাবা বলেও ডাকে না, কোনো কিছুই ভালো লাগছে না।

তিনি বলেন, এখন সারাক্ষণ কান্না করে। তার কান্নার সঙ্গে আমাদের মন ভারী হয়ে উঠছে। শুয়েও থাকে না। ঠিকমতো ঘুমও হয় না।

আরও পড়ুন: হাম কীভাবে ছড়ায়?

একই অবস্থা তিন বছরের শিশু রাফিয়া আখতারের। জানতে চাইলে রাফিয়ার বাবা জিহাদ হোসাইন বলেন, দুই দিন জ্বর ছিল এবং প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়েছিলাম। আর ভাবছিলাম ভালো হবে। আর ভালো হয়নি এবং দিনে দিনে অবস্থা খারাপ হতে থাকে। ভালো ডাক্তার দেখানোর পর জানতে পারি, রাফিয়ার হাম হয়েছে। এখন আমাদের প্রতিটা সময় কাটে চিন্তায়। পরিবারের ছোট মেয়ে সবার আদর আর যত্নের ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল আটটা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এবং লক্ষণ নিয়ে এই পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে ১২৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে এবং সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১৭০ জন। যাদের মধ্যে ৮৪৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৫৫ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। আর সবচেয়ে কম সাতজন ভর্তি হয়েছে রংপুরে।

অধিদপ্তর জানায়, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৩৩৪। এদের মধ্যে ৪ হাজার ৫৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী টিকাদানের ঘাটতির কারণে ২০২৩ সালে ৫৭টি দেশে বড় বা গুরুতর হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এটি আগের বছরের ৩৬টি দেশের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কার্যক্রমের আওতাধীন আফ্রিকান, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয়, ইউরোপীয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যায় ব্যাপক বৃদ্ধি দেখা গেছে। এই প্রাদুর্ভাবের প্রায় অর্ধেকই দেখা গেছে আফ্রিকা অঞ্চলে।

তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৩৪ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে। ইপিআইয়ের হিসাবে হাম–রুবেলার টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা ৩৪ লাখ বা তার বেশি। ২০২৩ সালে ৮৬ শতাংশ শিশু টিকার প্রথম ডোজ ও ৮১ শতাংশ শিশু দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে। চার–পাঁচ বছরে টিকা না পাওয়া বা অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা হয়েছে এক বছরে জন্ম নেওয়া শিশুর সমান বা তার বেশি।

আরও পড়ুন: হাম কেন হয়?

এদিকে ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের আট বিভাগে এ পর্যন্ত ৫১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৫৩ জন শিশু টিকা পেয়েছে। এ ছাড়া ১২টি সিটি করপোরেশনে টিকা পেয়েছে ৯ লাখ ৭৪ হাজার ২৪৭ জন শিশু।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান ঢাকা মেইলকে বলেন, সারাদেশে পুরোদমে টিকা কার্যক্রম চলছে। আগামী মাসের ২০ তারিখের মধ্যে শতভাগ শিশু টিকার আওতায় আসছে। ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। অনেক শিশু মারা যাচ্ছে এবং শিশুর অভিভাবকরাও এখন সচেতন হচ্ছে। শিশুর অভিভাবকরা নিজ উদ্যোগে খবর নিয়ে টিকা নিচ্ছে এবং সচেতনও করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারি ছুটির দিন টিকা কার্যক্রম বন্ধ থাকছে। নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্রের বাইরে টিকা দেওয়া হচ্ছে নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, মক্তব, এতিমখানা ও শিশু আশ্রমে। এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত পাঁচ বছরের কম বয়সী ছাত্রছাত্রীকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া যেসব শিশু স্কুলে যায় না কিংবা স্কুলে টিকা নেয়নি, তাদের কমিউনিটির নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে হামের টিকা দেওয়ার সংখ্যা বাংলাদেশে কমে গেছে। হাম থেকে বাঁচতে হলে টিকা দিতে হবে। অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রবণতা কমেছে মায়েদের। যার কারণে শিশুর হামসহ নানা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এটা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় হামের জীবাণু শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

রাজধানীর শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুব আলম বলেন, জ্বর হলে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। চোখ লাল, নাকে সর্দি ও কাশি আছে এবং গায়ে অ্যান্টির মতো র‍্যাশ উঠেছে; সেটাকে আমরা হাম বলি। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে অস্বাভাবিক আচরণ করছে কি না, এটাও দেখতে হবে। এ ধরনের কিছু হলে অবশ্যই শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে এবং চিকিৎসক দেখাতে হবে। সেইসঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে।

আরও পড়ুন: শয্যা বাড়িয়ে হামের রোগীকে সেবা দেওয়ার নির্দেশ স্বাস্থ্য অধিদফতরের

বিশেষজ্ঞদের মতে, সব ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক না হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি জটিল রূপ ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য ঝুঁকি বেশি। হামের জটিলতার মধ্যে রয়েছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখের সংক্রমণ, এমনকি বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ।

এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ডা. আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, হাম সংক্রমণ করোনার চেয়েও দ্রুত হয়। টিকা দিলেও তাৎক্ষণিকভাবে সেটির কার্যকারিতা পাওয়া যায় না। দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় হাসপাতালের সেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। দেশে আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিন জনের মৃত্যু হতো। এবার তা ১০ জনে পৌঁছেছে। মৃত্যুহার বাড়ার কারণ উদ্ঘাটনে সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে।

এসএইচ/এআর