নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম
টিকাদান কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরও প্রত্যাশিত ফল মিলছে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। কোথাও কোথাও টিকা না দিয়েই কাগজে-কলমে সাফল্যের তথ্য দেখানো হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
রোববার (১২ এপ্রিল) সকাল ১০টায় বিএমইউর মিল্টন হলে কন্টিনিউইং মেডিকেল এডুকেশন (সিএমই) সেশন ও গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগের আয়োজনে অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন শিশু অনুষদের ডিন ও বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আতিয়ার রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, একই ছাতার নিচে বিশেষজ্ঞদের একত্র করে জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা করা এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। সীমিত পরিসরের এই আলোচনা থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, যা সবার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, আলোচনার বিষয়গুলো জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন। সংক্রমণের অনেক পরে লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির অজান্তেই রোগটি ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, টিকাদান কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও অনেক ক্ষেত্রে তার প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও টিকা না দিয়েই দেওয়ার তথ্য দেখানো হচ্ছে। এ বিষয়গুলো চিহ্নিত করে যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলো নথিভুক্ত করে প্রস্তাব আকারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, যেখানে অংশগ্রহণকারীদের মতামত ও স্বাক্ষর থাকবে।
ক্লিনিশিয়ান হিসেবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, পরীক্ষার ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা একটি বড় বিষয়। সঠিক সময়ের আগে নমুনা সংগ্রহ করা হলে অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত নাও হতে পারে। এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ছয় মাসের আগেই হাম সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা আগে ধারণা করা হতো না। এতে বোঝা যায়, মায়ের শরীর থেকে প্রাপ্ত প্রতিরোধক্ষমতা সব ক্ষেত্রে শিশুর মধ্যে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে বুস্টার টিকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এজন্য গর্ভবতী নারীদের ওপর বড় পরিসরে গবেষণা চালিয়ে তাদের প্রতিরোধক্ষমতার অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। গবেষণার ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে কিশোরীদের জন্য অতিরিক্ত টিকা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বৈজ্ঞানিক তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরা জরুরি। প্রতিটি মহামারি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
আলোচনায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) কর্মকর্তা ডা. লোবাবা শারমিন বলেন, হামে আক্রান্ত রোগীদের ডায়রিয়া হলে স্বাভাবিক নিয়মেই চিকিৎসা দিতে হবে। বাসায় রেখেও ওআরএস খাওয়ানো সম্ভব। তবে শিশু বেশি দুর্বল হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, জনসচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে হামের সংক্রমণ আবার বাড়ছে। তারা টিকাদান কভারেজ বাড়ানো, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তে জোর দেন।
গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা হামের বিস্তার রোধে সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর কৌশল বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জ্বর হলেই হাসপাতালে ভিড় না করার পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, জ্বর হলেই হাম হয়েছে ধরে নিয়ে রোগীকে আলাদা করার প্রয়োজন নেই। তবে চার দিন পর শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে রোগীকে আলাদা রাখতে হবে।
আলোচনা সভায় বিএমইউর প্রো-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, বেসিক সায়েন্স ও প্যারাক্লিনিক্যাল সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী, নিওনেটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নান, পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. এরফানুল হক সিদ্দিকীসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।
অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, হাম থেকে সুরক্ষায় নারীদের গর্ভধারণের আগে, গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী করণীয় বিষয়ে সচেতনতা জরুরি।
হামের প্রকোপ ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির ইঙ্গিত দিচ্ছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, হামের পুনরুত্থানের কারণ চিহ্নিত করতে হবে। টিকাদানে কোথায় সমস্যা রয়েছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি।
অধ্যাপক ডা. আবেদ হোসেন মোল্লা বলেন, হাম একটি অতিসংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। গুরুতর অসুস্থ শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ ও আইসোলেশন ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
অধ্যাপক ডা. আতিয়ার রহমান বলেন, বর্তমানে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত করণীয় নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
এসএইচ/এআর