images

হেলথ

অর্থ সংকটে হার্ট হাসপাতালটির কাজে ধীরগতি

আব্দুল হাকিম

১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

  • দ্বিতীয় দফায় বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ
  • হাসপাতালের অনুমোদিত ব্যয় ২৩ কোটি ৮৮ লাখ
  • মোট পাঁচটি প্যাকেজের মধ্যে চারটি এখনো বাকি
  • মেডিকেল যন্ত্রপাতি ক্রয় বাকি, অ্যাম্বুলেন্স পরিকল্পনায়
  • দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার কথা রয়েছে

স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে নির্মাণাধীন হার্ট হাসপাতাল প্রকল্পের কাজ অর্থ সংকটের কারণে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ব্যয় না বাড়িয়ে দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানো হলেও যৌথ ব্যাংক হিসাবে প্রত্যাশিত অর্থ জমা না হওয়ায় প্রকল্পের কিছু কার্যক্রমে গতি কমেছে। তবে ভবনের মূল নির্মাণকাজের উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার আশা সংশ্লিষ্টদের।

মোট ২৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পে ভৌত অগ্রগতি তুলনামূলক ভালো হলেও আর্থিক অগ্রগতি কম। শর্ত পূরণ ও যৌথ হিসাবায় অর্থ জমা হলে অবশিষ্ট কাজ দ্রুত সম্পন্নের আশা করা হচ্ছে। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জে হৃদরোগ চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ (১ম সংশোধন)’ প্রকল্পের মেয়াদ ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পের সময়সীমা জুলাই ২০২০ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ এর পরিবর্তে জুলাই ২০২০ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি প্রকল্পটির দ্বিতীয় দফা সময় বৃদ্ধি শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডির মতামত পর্যালোচনা করে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, অবশিষ্ট কাজের পরিমাণ এবং প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

৬৫ শতাংশ কাজ শেষে থমকে গেছে ‘হাওর’ শিক্ষা প্রকল্প

প্রকল্পটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমাজসেবা অধিদফতর এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে। ‘বেসরকারি প্রচেষ্টায় আর্থ-সামাজিক খাতে গৃহীত প্রকল্পে সীমিত আকারে সরকারি সাহায্য প্রদানের নীতিমালা’র আলোকে এ প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এর মূল লক্ষ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি ১০০ শয্যা বিশিষ্ট বিশেষায়িত হৃদরোগ হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার পাশাপাশি হৃদরোগ নির্ণয়, প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং দরিদ্র রোগীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হবে। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারিত হয়েছে ২৩ কোটি ৮৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকা, যার মধ্যে ১৯ কেটি ১০ লাখ ৬৭ হাজার টাকা সরকারি তহবিল জিওবি এবং ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকা প্রত্যাশী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন। সময় বৃদ্ধি হলেও ব্যয় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

Hospital2
সময় বাড়লেও বাড়েনি বাজেট। ছবি: ঢাকা মেইল

তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের শুরু থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৮৪ লাখ ৩ হাজার টাকা, যা মোট অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে কম হলেও ভৌত অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে।

প্রকল্প পরিচালকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক বাস্তব অগ্রগতি প্রায় ৬৫ শতাংশ থেকে ৮৬ শতাংশের মধ্যে। বিশেষ করে হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পাঁচতলা ভিত্তির ওপর নির্মিত ৪ হাজার ১৭৭ দশমিক ৪ বর্গমিটার আয়তনের ভবনের ঢালাই ও ইট গাঁথুনির কাজ সম্পন্ন হয়েছে, লিফট স্থাপন করা হয়েছে এবং বর্তমানে টাইলস বসানো, প্লাস্টার ও গ্রিল সংযোজনের কাজ চলমান। ভবন নির্মাণ খাতে বরাদ্দের বড় অংশ ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে এবং কাজের অগ্রগতি মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনেও দৃশ্যমান হয়েছে।

প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রম অনুযায়ী মোট পাঁচটি প্যাকেজ অনুমোদিত ছিল, যার মধ্যে একটি সিভিল কনস্ট্রাকশন প্যাকেজ ইতোমধ্যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। অবশিষ্ট চারটি প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে আসবাবপত্র, মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, অফিস সরঞ্জাম এবং একটি অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়। হাসপাতাল ভবনের কাজ প্রায় সম্পন্ন হলে এসব প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, অবকাঠামো প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র ক্রয় শুরু করলে তা সংরক্ষণ ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

ব্যয় বেড়েছে ১৫০ শতাংশ, বিতর্কে বিফট প্রকল্প

প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে উঠে এসেছে প্রত্যাশী সংস্থার নিজস্ব অর্থ জমা না হওয়া। নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী সংস্থার হারাহারি অংশ যৌথ ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো সম্পূর্ণ অর্থ জমা হয়নি। এর ফলে ক্রয় প্রক্রিয়া ও কিছু আর্থিক লেনদেন কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে। যৌথ হিসাবায় অর্থ জমা নিশ্চিত হলে বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে ক্রয় প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধে কিছু বিলম্ব হওয়ায় আর্থিক অগ্রগতির হার কম দেখা যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

আইএমইডির পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ দল বলছে, ভবন নির্মাণ কাজে প্রস্তাবিত ভেরিয়েশন অর্ডার যাচাই করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া নিয়মিত প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি এবং প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটির সভা আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প সমাপ্তির তিন মাসের মধ্যে প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন দাখিল করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পূর্ববর্তী কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন এখনো প্রেরণ করা হয়নি বলেও পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণ দল বলছে, পরিদর্শনকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা ও সদর উপজেলায় প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক, গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তা এবং প্রত্যাশী সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে আলোচনায় প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা, অর্থায়ন পরিস্থিতি এবং অবশিষ্ট কাজের সময়সূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মাঠপর্যায়ের বাস্তব অগ্রগতি ও প্রশাসনিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে বর্ধিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মত দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের লক্ষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালটি চালু হলে স্থানীয় জনগণ বিশেষ করে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীরা সাশ্রয়ী ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা পাবেন বলে জানান কর্মকর্তারা। তারা বলেন, এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে আঞ্চলিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দরিদ্র রোগীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় উন্নত হৃদরোগ চিকিৎসা সেবার যথেষ্ট সুযোগ না থাকায় রোগীদের বাধ্য হয়ে রাজশাহী বা ঢাকার মতো বড় শহরে যেতে হয়। এতে যেমন চিকিৎসা পেতে দেরি হয়, তেমনি অতিরিক্ত যাতায়াত খরচ ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। জরুরি মুহূর্তে দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ তাদের।

Hospital3
দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার দাবি এলাকাবাসীর। ছবি: ঢাকা মেইল

স্থানীয় বাসিন্দা আহমদ আলী বলেন, আমাদের এলাকায় ভালো কোনো হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। কারও হার্টের সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহী বা ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়, যা খুবই কষ্টকর। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জন্য এই খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় টাকা জোগাড় করতে দেরি হওয়ায় রোগীর ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি আরও বলেন, এখানে যদি একটি আধুনিক হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা হতো, তাহলে স্থানীয় মানুষ সহজেই দ্রুত চিকিৎসা পেতেন এবং অনেক জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন এলাকাবাসী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ কার্যক্রমও এ কেন্দ্রের মাধ্যমে জোরদার করা সম্ভব হবে। তবে সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক শর্তগুলো কঠোরভাবে প্রতিপালন জরুরি।

আরও পড়ুন

ব্যয় কমানোর অঙ্গীকার নিয়ে উল্টোপথে হেঁটেছে অন্তর্বর্তী সরকার!

নামোশংকরবাটী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সভাপতি আসলাম কবির ঢাকা মেইলকে বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইতোমধ্যে ডায়াবেটিস ও চক্ষু হাসপাতাল রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য অনেক উপকারে আসছে। তবে জেলায় একটি হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হলে তা বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। এতে স্থানীয় মানুষ সহজেই হৃদরোগের চিকিৎসা নিতে পারবে এবং দূরে যেতে হবে না।

তিনি আরও বলেন, অনেক মানুষের ঢাকায় বা রাজশাহীতে গিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই, ফলে তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। তাই দ্রুত হার্ট ফাউন্ডেশন স্থাপন করা জরুরি। এতে বাস্তবায়ন দেরি হলে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দ্রুত এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসীর জন্য তা বড় উপকার বয়ে আনবে বলে মনে তিনি।

 এএইচ/জেবি