নিজস্ব প্রতিবেদক
০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩১ এএম
দেশে হামের সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬৮৫ শিশু উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এ সময় মারা গেছে চার শিশু। একই সময়ে ২৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট তিন হাজার ৭০৯ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এদের মধ্যে দুই হাজার ৩৬৩ জনকে ভর্তি করতে হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৫৮৫ জন। এই সময়ের মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হাম আক্রান্ত ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ২৭ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, আক্রান্তদের বড় একটি অংশ আগে টিকা নেয়নি। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, আক্রান্তের প্রায় ৭১ শতাংশই টিকার আওতার বাইরে ছিল।
তিনি বলেন, সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এটি ‘আউটব্রেক রেসপন্স’ হিসেবে সীমিত পরিসরে চালু হলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী এর পরিধি বাড়ানো হবে।
ছয় মাস থেকে ১০ বছর বয়সী যেসব শিশু এখনও কোনো ডোজ পায়নি, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, টিকা নেওয়ার পর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে প্রায় ১৪ দিন সময় লাগে। তবে সংক্রমণের আগে টিকা নিতে না পারলেও পরে নিলে রোগের তীব্রতা কমে, হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন কমে এবং মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস পায়।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব হঠাৎ বেড়েছে। গতকাল ঢাকা শিশু হাসপাতালে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, হাম বজ্রপাতের মতো এসেছে। আমাদের আগে থেকে প্রস্তুতি ছিল না। তবে অল্প সময়ের মধ্যে আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত হয়েছি।
আরও পড়ুন: হাম কীভাবে ছড়ায়, প্রতিকার কী
তিনি বলেন, নতুন করে টিকা সংগ্রহের জন্য চাহিদা দেওয়া হয়েছে, যা পেতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্যাভির মজুত থেকে টিকা নিয়ে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, গত দুই থেকে আড়াই সপ্তাহে মৃত্যুহার কিছুটা কমেছে, অনেক শিশু দ্রুত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়ছে। গুরুতর রোগীর চিকিৎসার জন্য ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থাও বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে নতুন একটি বহির্বিভাগ (আউট পেশেন্ট) ইউনিট চালু করা হয়েছে। গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ ইউনিটের উদ্বোধন করেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন এ সেবাকেন্দ্র চালু হওয়ায় চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়বে। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত রোগীরা আরও সহজে সেবা পাবে।
হামের প্রকোপ প্রতিরোধে অবিলম্বে আক্রান্ত এলাকার স্কুলে অস্থায়ীভাবে সশরীরে ক্লাস বন্ধ এবং অনলাইনে তা চালানোর নির্দেশনা চেয়ে রিট করা হয়েছে। একই সঙ্গে সম্প্রতি হামের কারণে ৪৭ শিশু মৃত্যুর ঘটনায় উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। গতকাল হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় জনস্বার্থে এ রিট করেন ব্যারিস্টার লুৎফে জাহান পূর্ণিমা।
রিটে হামের প্রকোপে শিশুমৃত্যু রোধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা বা ব্যর্থতা কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির আরজি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া মৃত্যুর সংখ্যা, আক্রান্তের সংখ্যা, ভ্যাকসিনেশন কভারেজ, ভ্যাকসিনেশন সরবরাহ-সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবারকল্যাণ বিভাগসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিবাদী করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: এবার ৬ মাসের শিশুরাও পাবে হামের টিকা
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা, টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত না করা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় ঘাটতি সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আবেদনে টিকাদানে ব্যর্থতা, টিকার ঘাটতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় বিলম্বের কারণ অনুসন্ধানে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও সময়াবদ্ধ তদন্ত পরিচালনার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। কেন সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তদন্ত করে সেই ফল আদালতের সামনে উপস্থাপনের আরজি জানানো হয়েছে। হাইকোর্টের অবকাশকালীন একটি বেঞ্চে আগামী সপ্তাহে শুনানি হতে পারে।
ব্যারিস্টার লুৎফে জাহান পূর্ণিমা বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুরা আসলেই হামে আক্রান্ত কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া। অনেক চিকিৎসক বলছেন, এটি করোনাভাইরাসের আপডেটেড কোনো ভার্সন হতে পারে। শিশুদের শরীরের ছবিগুলো দেখে এটি হাম কিনা, তা নিয়েও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
এমআই