নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:৫৪ পিএম
শুধুমাত্র গবেষণাপত্র প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ নয়, গবেষণার ফলাফল বাস্তবে প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) রাজধানীর মহাখালীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে তারা এসব বলেন। সেমিনারের বিষয় ছিল ‘দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে পুষ্টি গবেষণার অর্ধ-শতাব্দীর যাত্রা’।
কয়েক দশকজুড়ে বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ও জনস্বাস্থ্যে প্রভাবের যাত্রাকে তুলে ধরতে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে যোগ দেন কূটনীতিক, গবেষক, অ্যালামনাই, উন্নয়ন সহযোগী এবং আইসিডিডিআরবির কর্মীরা।
সেমিনারে আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গবেষণাপত্র প্রকাশ নয়; বরং সেইসব গবেষণার ফল বাস্তবে প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা। এসব প্রভাব তৈরি সম্ভব হয়েছে আমাদের বিজ্ঞানী, ল্যাব, হাসপাতাল ও মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের নিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও দাতা দেশগুলোর সমর্থনের পাশাপাশি স্থানীয় দাতাগোষ্ঠী, শিল্প, ব্যবসা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান অবদানের মাধ্যমে।’
সভায় ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসনের অনুপস্থিতিতে তাঁর বক্তব্য পাঠ করেন দূতাবাসের সিনিয়র হেলথ স্পেশালিস্ট সুষ্মিতা খান। বার্তায় উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র আইসিডিডিআরবির পাশে আছে, এবং এই অংশীদারত্ব গবেষণার অগ্রগতি, বৈশ্বিক নীতি প্রণয়ন এবং বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বিবৃতিতে ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন রোগতত্ত্ব নজরদারি, প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ ও টিকা গবেষণায় আইসিডিডিআর,বির অবদানের প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্রের 'অ্যামেরিকা ফার্স্ট গ্লোবাল হেলথ স্ট্র্যাটেজি'র অধীনে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং আইসিডিডিআরবির বিশ্বমানের গবেষণা এবং সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদানের অনন্য সমন্বয়ের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, কানাডার সঙ্গে আইসিডিডিআরবির দীর্ঘ অংশীদারিত্ব কানাডার জন্য জাতীয় গৌরব।
অজিত সিং বলেন, বাংলাদেশের কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্য সমস্যা আজকের পৃথিবীতে কানাডা ও বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্যও প্রাসঙ্গিক। শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ছাড়া অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা ধরে রাখা সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জনস হপকিন্স ক্রমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর জর্জ জি, গ্রাহাম প্রফেসর অব ইনফ্যান্ট অ্যান্ড চাইন্ড নিউট্রিশন, অধ্যাপক কিথ পি. ওয়েস্ট জুনিয়র। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় বাংলাদেশে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়, এবং তিনি বাংলাদেশ, নেপাল ও ইন্দোনেশিয়া জুড়ে পাঁচ দশকের গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন যা অনুপুস্টির ঘাটতি, মাতৃ পুষ্টি এবং শিশুর বেঁচে থাকার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। অধ্যাপক ওয়েস্ট বাংলাদেশে পরিচালিত তাঁর একাধিক গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে বলেন, গর্ভধারণের আগেই নারীদের পুষ্টির উন্নয়ন সুস্থ গর্ভাবস্থা ও নবজাতকের ভালো শারীরিক অবস্থার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ওয়েস্ট তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বাংলাদেশের প্রথম সংস্করণের মানচিত্র, ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস) প্রস্তুতের একটি প্রাথমিক পরিমাপযন্ত্র এবং কয়েকটি ঐতিহাসিক বই স্মারক হিসেবে ড. তাহমিদ আহমেদকে উপহার দেন।
উল্লেখ্য, দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে এই বছর আইসিডিডিআরবির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হয়। প্রথম দিনে ২৬ নভেম্বর আয়োজন করা হয় আনন্দমেলা, যেখানে বিভাগীয় প্রদর্শনী ও বিভিন্ন স্টলে কর্মীরা কারুশিল্প, পোশাক, খাদ্যসামগ্রী প্রদর্শন করেন এবং গবেষণা দলগুলো নিজেদের গবেষণার প্রভাব ও উদ্ভাবন উপস্থাপন করেন।
প্রথম দিনের উদযাপনটি আইসিডিডিারবির কর্মীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়। ২৭ নভেম্বরের সেমিনারের মধ্য দিয়ে উদযাপন অব্যাহত থাকে, যার মাধ্যমে আইসিডিডিআরবি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্ব আবারও তুলে ধরা হয়।
এসএইচ/ক.ম