মাহফুজ উল্লাহ হিমু
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৯:৩১ পিএম
বছরের নবম মাসেও সংক্রমণ ও মৃত্যু ঘটিয়ে যাচ্ছে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। এতদিন অনেকটা নগরকেন্দ্রিক থাকলেও চলতি বছর রোগটি সারাদেশেই ছড়িয়েছে। ফলে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অব্যাহত রয়েছে। এতে সরকারি হাসপাতালগুলোতেও দেখা দিচ্ছে শয্যা সংকট। ফলে রোগীদের বাধ্য হয়েই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালে।
তবে এসব হাসপাতালের লাগামহীন খরচের বোঝা রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বজনদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অপরদিকে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু সেবা বিনামূল্যে হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে চিকিৎসায় টাকা গুণতে হচ্ছে রোগীদের।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টসের ২০২০ সালে পরিচালিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যক্তি পর্যায়ের ব্যয়ের মাধ্যমে বা আউট অব পকেট খরচ হয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের এক গবেষণাতেও একই চিত্র দেখা যায়। ২০১৯ সালে বিভাগটির অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ ও তার সহকর্মীদের পরিচালতি গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে একজন ডেঙ্গু রোগীর গড় খরচ ১১ হাজার টাকা। আর ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীর সরকারি হাসপাতালে খরচ ২০ হাজার টাকা।
এ ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতালকে গবেষকেরা তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেন। সবচেয়ে দামি বা ‘ক’ শ্রেণির হাসপাতালে একজন রোগীর গড় খরচ ছিল দুই লাখ টাকা। ‘খ’ শ্রেণির হাসপাতালে গড়ে খরচ ছিল ৪১ হাজার টাকা। সর্বশেষ ‘গ’ শ্রেণির হাসপাতালে খরচ ছিল ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা। এসব খরচ রোগীর ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, শয্যা ভাড়া, চিকিৎসকের ফি, যাতায়াত ভাড়া বাবদ হিসেব করা হয়েছিল। বর্তমান বাস্তবতায় যা কয়েক গুণ বেড়েছে।
বেসরকারি হাসপাতালে খরচের সীমা নেই
ঢাবির স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের গবেষণায় হাসপাতালগুলোকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করে চিকিৎসা গড় ব্যয় দেখানো হয়েছে। যা বহুলাংশেই রোগীর শারীরিক জটিলতার উপর নির্ভর করে। একই সঙ্গে হাসপাতালের ক্যাটাগরি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যার উপর ভিত্তি করে চিকিৎসার খরচের কোনো সীমা নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করা দুইজন ব্যক্তির স্বজনদের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। রোগীদের দুইজনই বড় কোনো জটিলতা ছাড়াই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাদের আইসিইউ বা প্লাটিলেট গ্রহণের প্রয়োজন পড়েনি।
তাদের মধ্যে একজন রাজধানীর রামপুরার পশ্চিম হাজীপাড়ার বাসিন্দা বিজয়া। গত ১৭ আগস্ট ডেঙ্গু শনাক্ত হয় ২৫ বছর বয়সী বিজয়ার। পরে জ্বরের পাশাপাশি ডায়রিয়ার দেখা দেওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ১৮ আগস্ট বিকেলে রামপুরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। সেখানে চিকিৎসা গ্রহণের পর মোটামুটি সুস্থ অবস্থায় ২০ আগস্ট সকালে হাসপাতাল ছাড়েন বিজয়া। এই সময়ে তার মোট ১২ হাজার ২৯২ টাকা হাসপাতাল বিল পরিশোধ করতে হয়েছে।
খরচের বিষয়ে জানতে চাইলে এই রোগীর ভাই গোপাল ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার বোনের ডেঙ্গু জ্বরের পাশাপাশি ডায়রিয়া দেখা দেয়। এর মাঝে তার রক্তচাপ কমতে থাকে। চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। ওই সময় নিকটতম সরকারি হাসপাতাল মুগদা মেডিকেল রোগীর চাপ অত্যাধিক বেশি থাকায় এবং বোনের ছোট বাচ্চা থাকায় যাতায়াতের সুবিধার্থে পাশের বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করি। ১৮ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে থাকা অবস্থায় আমাদের মোট ১২ হাজার ২৯২ টাকা বিল আসে। যার মধ্যে ভর্তি ফি ৫০০, শয্যা ভাড়া ৩ হাজার, চিকিৎসক ফি বাবদ ২ হাজার ২০০ টাকা, পরীক্ষা বাবদ ৩ হাজার ৪৪০, ওষুধ বাবদ ১ হাজার ৯৬৩ এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ রয়েছে। এছাড়া সার্ভিস চার্জ বাবদ ৯৩৯ টাকাসহ মোট ওই বিল পরিশোধ করতে হয়েছে।
একই চিত্র অপর রোগী মিহিরের ক্ষেত্রেও। গত ২১ আগস্ট রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকার একটি মেসের বাসিন্দা মিহির ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। এর দুইদিন আগে থেকেই তিনি জ্বরে ভুগছিলেন। ডেঙ্গু শনাক্তে পর তার শরীর দুর্বল থাকায় তাকে বেসরকারি আদ দ্বীন মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিন দিন চিকিৎসা গ্রহণ করেন তিনি। এই সময়ে তার প্রায় ৯ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
এ বিষয়ে রোগীর খালাতো ভাই এনামুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার খালাতো ভাই ডেঙ্গু শনাক্তের কয়েকদিন আগে থেকে জ্বরে ভুগছিল। এই সময়ে সে একদমই খাবার খেতে পারছিল না। তবে তার জ্বরের বিষয়টি সে পরিবারের কাউকে জানায়নি। পরে জানার পর আমরা তার ডেঙ্গু পরীক্ষা করাই। পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। প্রথম কিছুদিন পর্যন্ত খাবার না খাওয়ায় সে শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় তাকে আমার বাসার পাশে হওয়ায় আদ-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি করি। হাসপাতালটিতে সে মোট তিনদিন ভর্তি ছিল। এই সময়ে শয্যা ভাড়া বাবদ তিন হাজার ৬০০ টাকা এবং ওষুধ ও চিকিৎসক ফি বাবদ প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়।
বিনামূল্যে হলেও সরকারি হাসপাতালে ব্যয়ের বোঝা
ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার প্রধান ভরসা সরকারি হাসপাতাল। স্বল্প খরচে ভালো চিকিৎসার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের। এর অন্যতম কারণ এখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা মেলে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, চলতি বছরে ডেঙ্গু চিকিৎসায় সরকার মোট ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। রোগীপ্রতি গড় ব্যয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। দুঃখজনকভাবে সরকারের এত টাকা ব্যয়ের পরেও ডেঙ্গু চিকিৎসা পেতে ব্যক্তি পর্যায়েও খরচ হচ্ছে রোগীদের।
তেমনি একজন আব্দুল লতিফ (ছদ্মনাম)। ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে চারদিন ১২ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে ভর্তি ছিলেন তিনি। এই সময়ে সবমিলিয়ে তার প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
এ বিষয়ে আব্দুল লতিফ ঢাকা মেইলকে বলেন, সরকারি হাসপাতাল হিসেবে বেড ভাড়া দিতে হয়নি। তবে খরচ নেই তা নয়। প্রতিদিন রক্ত পরীক্ষা করানোর খরচ আছে। অনেক সময় হাসপাতাল থেকে ওষুধের সাপ্লাই নেই বলে জানানো হয়েছে। তখন বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনতে হয়েছে। হাসপাতাল থেকে যে খাবার দেয় তা বাচ্চা খেতে পারে না। তাই বাইরে থেকে খাবারও আনতে হয়েছে। এছাড়া আয়-ওয়ার্ডবয়দের বকশিসের বিষয় রয়েছে। ফলে ফ্রিতে চিকিৎসার কথা থাকলেও খরচ ঠিকই হয়েছে।
এমএইচ/আইএইচ