খলিলুর রহমান
১৯ জুন ২০২৩, ১০:১০ এএম
রাজধানীর গ্রিন রোডে অবস্থিত সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় নবজাতকের পর মা মাহমুদা রহমান আঁখিও মারা গেছেন। এরপর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘা ঢাকা দিয়েছেন। তবে কর্মরত নার্স ও কর্মচারীরা একরকম আতঙ্ক নিয়েই দায়িত্ব পালন করছেন এখনো। যদিও ভুল চিকিৎসায় নবজাতক ও মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় ইতোমধ্যেই হাসপাতাল ছাড়তে শুরু করেছেন রোগীরা। আর যেসব রোগী এখনো চিকিৎসাধীন আছেন, তারাও অজানা এক আতঙ্কে রয়েছেন।
রোববার (১৮ জুন) রাতে সেন্ট্রাল হাসপাতাল ঘুরে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। তবে হাসপাতালে দায়িত্বরতরা এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালের তৃতীয় তলায় রয়েছে অপারেশন থিয়েটার। আর চার তলা থেকে ১০ তলা পর্যন্ত রোগীদের কেবিন ও ওয়ার্ড। তবে বর্তমানে এসব ওয়ার্ডে কতজন রোগী আছে, এর সঠিক কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও প্রতিটি তলায় একটি বোর্ডে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা উল্লেখ রয়েছে। পরে ওইসব বোর্ডে থাকা রোগীর সংখ্যা হিসেব করে দেখা গেছে হাসপাতালটিতে মোট ৩৪ জন রোগী ভর্তি আছেন।
রোববার রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সেন্ট্রাল হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের চতুর্থ তলায় মোট চারজন রোগী ভর্তি আছেন। পাশাপাশি ৫ম তলায় মাত্র এক জন ছাড়াও ষষ্ঠ তলায় ১০ জন, ৭ম তলায় সাতজন, ৮ম তলায় তিনজন, ৯ম তলায় পাঁচজন এবং ১০ তলায় আটজন রোগী ভর্তি আছেন। এরমধ্যে চতুর্থ তলায় চিকিৎসকদের চেম্বার থাকলেও সেখানে কোনো রোগী পাওয়া যায়নি। তবে দ্বিতীয় তলায় চিকিৎসকদের চেম্বারে রোগী ও তাদের স্বজনদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। সেখানেও সবার মাঝে চাপা এক আতঙ্ক দেখা গেছে।
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার বাসিন্দা সুলতানা এসেছেন ডাক্তার দেখাতে। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, আমি এই হাসপাতালে প্রথম এসেছি। তবে এখানে এসে এক রোগীর ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর খবর জানতে পারি। এরপর থেকেই আমার মনেও ভয় করছে।
সুলতানা বলেন, এখানে আসার পর থেকেই বিরক্ত লাগছে। এখানে কোনো নিয়মই নেই। সন্ধ্যায় আসছি, কিন্তু এখন রাত সাড়ে ১০টা। এখনো ডাক্তার দেখাতে পারি নাই।
কত নম্বর সিরিয়াল ও কোন ডাক্তারের কাছে এসেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিরিয়াল ৫০ নম্বর। এখন চলছে ৩০ নম্বর। তবে ডাক্তার নাম না বলাই ভালো। কারণ মিডিয়াতে আসলে আমার চিকিৎসাও ভালো করে দেবে না।
এদিকে, রোববার রাত ১০টা ৫৭ মিনিটে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে দেখা গেছে, ভেতরের সবগুলো লাইট বন্ধ রয়েছে। তবে অপারেশন থিয়েটারের বাইরে সবুজ পোশাক (ওটি ড্রেস) পড়ে এক ব্যক্তিকে বসে থাকতে দেখা যায়। পরে সেই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চান। পরবর্তীতে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়- অপারেশন বন্ধ না কি চলছে? এ সময় তিনি উত্তর দেন অপারেশন বন্ধ আছে। তবে কি কারণে তিনি সবুজ পোশাক (ওটি ড্রেস) পড়ে বসে আছেন- এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
অন্যদিকে, রোববার দুপুর ১টা ৪৩ মিনিটে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে মারা যান মাহবুবা রহমান আঁখি। পরে ল্যাবএইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এ সময় ল্যাবএইড হাসপাতালের পক্ষ থেকে জনসংযোগ কর্মকর্তা চৌধুরী মেহের-এ-খোদা রোগীর মৃত্যুর কারণসহ সামগ্রিক তথ্য তুলে ধরেন। তবে সেখানে আঁখির চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেলে বোর্ডের ৬ সদস্যের কেউই ছিলেন না। এমনকি ছিলেন না কোনো চিকিৎসকও। ফলে সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্ন থাকলেও তিনি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বাইরে কিছুই বলতে পারেননি।
চৌধুরী মেহের-ই-খোদা জানান, গত ১০ জুন বিকেল ৩টা ৩৯ মিনিটে মাহবুবা রহমান আঁখিকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাকে অচেতন অবস্থায় লাইফ সাপোর্টে অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তখন তিনি অচেতন অবস্থায় ছিলেন এবং তার প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ ও হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল।
এদিকে, রোববার বিকেল ৫টার দিকে মা ও ছেলের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। আজ সোমবার (১৯ জুন) তাদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে বলে জানা গেছে।
তবে রোববার রাতে ঢাকা মেডিকেলের মর্গের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন আঁখির স্বামী ইয়াকুব আলী সুমন। এ সময় তিনি বলেন, তারা আমার স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যা করেছে। আমি তাদের ফাঁসি চাই। ডাক্তার সংযুক্তা সাহাকে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি আবেদন জানাই। আমার স্ত্রী ও সন্তানকে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করেছে। আমার স্ত্রী মৃত্যুর আগে আমার ছেলের নাম ইরহাম আব্দুল্লাহ আরাফ রেখে গিয়েছিলেন।
গত তিন মাস ধরে সেন্ট্রাল হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহার অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মাহবুবা রহমান আঁখি। তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল বলেও জানিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। ফলে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমেই সন্তান প্রসব সম্ভব বলে তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন ডা. সংযুক্তা সাহা।
প্রসব ব্যথা ওঠায় গত ৯ জুন রাত ১২টা ৫০ মিনিটে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ডা. সংযুক্তা সাহার অধীনে ভর্তি করা হয় আঁখিকে। তখন ডা. সংযুক্তা সাহা হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন না। তারপরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনি আছেন এবং ওটিতে (অপারেশন থিয়েটার) কাজ করছেন।
ভুক্তভোগীর স্বামী ইয়াকুব আলী জানিয়েছিলেন, তার স্ত্রীকে যখন অটিতে ঢুকানো হয় এবং নরমাল ডেলিভারির জন্য চেষ্টা শুরু করা হয়, তখনও সংযুক্তা সাহা হাসপাতালে আছেন কি না জানতে চাওয়া হয়। ওই সময়ও কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনি আছেন এবং তিনি তার চেষ্টা চালাচ্ছেন। পরে জানা যায় ডা. সংযুক্তা সাহা ছিলেন না এবং তারা রোগীর কোনোরকম চেক-আপ ছাড়াই ডেলিভারির কাজ শুরু করে দেন। এ ঘটনায় ওইদিন রাতেই আঁখি সেন্সলেস হয়ে যায়। পরে শেষ পর্যন্ত তার কোনো ইমপ্রুভমেন্ট হয়নি।
এদিকে, ভুল চিকিৎসায় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গত ১৫ জুন ধানমন্ডি থানায় ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’র একটি মামলা দায়ের করেছেন ইয়াকুব আলী। মামলায় ডা. শাহজাদী মুস্তার্শিদা সুলতানা, ডা. মুনা সাহা, ডা. মিলি, সহকারী জমির, এহসান ও হাসপাতালের ম্যানেজার পারভেজকে আসামি করা হয়। এছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকেও আসামি করা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর গত ১৫ জুন রাতে ডা. শাহজাদী ও ডা. মুনা সাহাকে হাসপাতাল থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় রোববার সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা ও কর্তৃপক্ষের প্রতারণায় মাহবুবা রহমান আঁখির মৃত্যুর ঘটনায় আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেছেন, সেন্ট্রাল হসপিটালের ঘটনাটি আমাদের নজরে এসেছে। সেখানে একজন প্রসূতি মায়ের মৃত্যু খুবই দুঃখজনক।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সেন্ট্রাল হসপিটালে আমরা টিম পাঠিয়েছিলাম, কী কী জিনিসের ঘাটতি ছিল সেখানে গিয়ে তারা সার্বিক অবস্থা দেখেছে। অপারেশনসহ কিছু কার্যক্রমও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যে পর্যন্ত তাদের ঘাটতিগুলো পূরণ না হবে সে পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না।
সেন্ট্রাল হাসপাতালের বিরুদ্ধে আমরা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি জানিয়ে তিনি বলেন, এখন তো বিষয়টি পুরোপুরি আইনের হাতে চলে গেছে। এখন যা ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটা আইনানুযায়ী নেওয়া হবে।
এদিকে, ভুল চিকিৎসায় মাহবুবা রহমান আঁখি ও নবজাতক সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় সেন্ট্রাল হাসপাতাল ঘেরাওয়ের ঘোষণা দিয়েছেন আঁখির সহপাঠীরা। রোববার বিকেলে ল্যাবএইড হাসপাতালে অবস্থান করা আঁখির সহপাঠী ও ৭ কলেজের শিক্ষার্থীরা এই ঘোষণা দেন। ওই সময় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেন্ট্রাল হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল ছাড়াও সংযুক্তা সাহাসহ দায়ী প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। এই দাবি আদায় না হলে হাসপাতাল ঘেরাও করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
কেআর/আইএইচ