রেজওয়ান সিদ্দিকী অর্ণ
৩১ মার্চ ২০২২, ০৫:১১ পিএম
শেষ কবে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক আলোচিত হয়েছে— তা স্মরণ করতে হয়ত বড়সড় চাপ পড়তে পারে মস্তিষ্কে। তবে সম্প্রতি ‘নিহত নক্ষত্র’ শিরোনামের একটি নাটক দর্শকের মনোজগতকে আন্দোলিত করেছে। স্বাধীনতার ৫১ বছরে দাঁড়িয়ে এ প্রজন্ম যেন ফিরে গিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সেই লোমহর্ষক দিনগুলোতে।
গেরিলা যোদ্ধা শহীদ আজাদের ওপর পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন এবং তার মায়ের ত্যাগ স্বীকার এই নাটকের প্রেক্ষাপট। এটি নির্মাণ করেছেন সঞ্জয় সমদ্দার। চিত্রনাট্য লিখেছেন ইসতিয়াক অয়ন। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে নাটকটি বানিয়েছেন পরিচালক। তবুও চেষ্টা করেছেন সাধ্যের মধ্যে সেরাটা নির্মাণের। ঢাকা মেইলকে সঞ্জয় সমদ্দার বলেন, ‘এই সময়ে এসে মুক্তিযুদ্ধের গল্পে নাটক নির্মাণ করা কঠিন কাজ। এ ধরনের কাজ করতে প্রচুর লজিস্টিক সাপোর্ট দরকার। কিন্তু আমাদের সেটা অপ্রতুল। নেই বললেই চলে। প্রথমে এই গল্পে আমি সিনেমা বানাতে চেয়েছিলাম। দুর্ভাগ্য যে, কোনো প্রযোজক অর্থলগ্নি করতে রাজি হননি। তারপর বাধ্য হয়ে নাটক বানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘যখন এটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিই, তখন চ্যালেঞ্জটা আরও বেড়ে যায়। কেননা, আমাকে মাত্র ৪০ মিনিটের মধ্যে গল্প এস্টাবলিশ করতে হবে। শহীদ আজাদ আমাদের কাছে আবেগের নাম। সেই আবেগটা এই সময়ের মধ্যে তুলে ধরা কঠিন। মুক্তিযুদ্ধের কাজের জন্য আমরা আলাদা করে বাজেট পাই না। সাধারণ নাটক নির্মাণ করতে যে বাজেট বরাদ্দ থাকে, সেটাই দেওয়া হয়। কিন্তু দু’ধরনের নাটকের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। ১৯৭১ সালের দিনগুলো দেখাতে হলে সেভাবে সেট তৈরি করতে হয়। আলাদা কস্টিউমের দরকার। এত সীমাবদ্ধতা থাকার পরও আমার দেশপ্রেমের জায়গা থেকে ভালো কাজের চেষ্টা করেছি।’
গল্পটি নিয়ে নাটক নির্মাণ করলেও সিনেমা নির্মাণের ইচ্ছা কর্পূরের মতো উবে যায়নি সঞ্জয়ের। এখনও বিশ্বাস করেন, আজ কিংবা কাল— ঠিকই শহীদ আজাদের এই কাহিনি বড় পর্দায় তুলে ধরবেন। সঞ্জয় বলেন, ‘এই গল্প নিয়ে আমি চলচ্চিত্র করতে চাই। এর চিত্রনাট্য তৈরি আছে। অনেক বড় পরিসরে গল্পটি বলব। আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমাগুলো দায়সারা গোছের হয়। আমি তেমন কিছু বানাতে চাই না। গবেষণার কাজটা ঠিকঠাকভাবে করে সামনে এগোব।’
নাটকটিতে শহীদ আজাদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন অপূর্ব। দর্শকের কাছে তো তিনি স্টার মার্কস পেয়েছেন। পরিচালকের মুখে ঝরল তার গুণগান।
সঞ্জয়ের কথায়, ‘আমরা একটানা ১৮ ঘণ্টা শুটিং করেছি। খাওয়ার সময় ছিল না। এমনও হয়েছে শুটিং প্যাকআপ করেছি ভোর ছয়টায়। যেহেতু বাজেট কম ছিল, বাড়তি দিন শুটিংয়ের সুযোগ ছিল না। নির্দিষ্ট সময়ে কাজটি শেষ করতে অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন অপূর্ব। একজন পরিচালক হিসেবে তার আন্তরিকতা কোনো বাক্য দ্বারা ব্যাখ্যা করতে পারব না। বিহাইন্ড দ্য সিন দর্শক দেখেন না। দেখলে হয়ত বুঝতে পারতেন, শহীদ আজাদ চরিত্রটি নিজের ভেতর কতটা ধারণ করেছেন তিনি।’
নাটকের মতো সিনেমায়ও কি শহীদ আজাদ চরিত্রে অপূর্বর ওপর ভরসা রাখবেন— জানতে চাইলে সঞ্জয় বলেন, ‘শহীদ আজাদের সঙ্গে অপূর্বর চেহারার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আমার মনে হয় না, চরিত্রটি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তার বিকল্প কেই আছেন। সুতরাং সিনেমায়ও তিনি আমার প্রথম পছন্দ।’
এদিকে শুধু অপূর্ব নন, মায়ের চরিত্রে মুনিরা মিঠু অসাধারণ অভিনয় করেছেন বলে মনে করেন এ পরিচালক। তার মতে, নাটকের অন্যতম প্রাণ ছিলেন তিনি।
আজাদের মা ছেলের মুখে ভাত তুলে দিতে পারেননি বলে ১৪ বছর ভাত না খেয়েছিলেন। ছেলে খাটে ঘুমাতে পারত না বলে আমৃত্যু মাটির বিছানায় ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। মা-ছেলের এই অকৃত্রিম ভালোবাসার চিত্র পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পেরে অনেকটাই তৃপ্ত সঞ্জয় সমদ্দার। সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে দেশের জন্য জীবনবাজি রাখা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করতে চান।
আরএসও