Dhaka Mail Logo

বিনোদন

গানটাকে পেশা হিসেবে নিতে পারলাম না, তাই খারাপ লাগে: আসাদুল্লাহ দেহলভী

রাফিউজ্জামান রাফি

০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম

বহু দিন আগেই গীতিকারের জীবন ত্যাগ করে সাধারণের ভিড়ে মিশে গেছেন আসাদুল্লাহ দেহলভী। অথচ তার গান আজও শাসন করছে মঞ্চ, নিয়ন্ত্রণ করছে উত্তাল জনসমুদ্র, দুরন্ত পথিককে করছে ভাবুক। জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা জেমসের ক্যারিয়ারের ভিত শক্ত করা অসংখ্য গানের স্রষ্টা এই দেহলভী। 

সম্প্রতি ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ব্যান্ড সংগীতের বিস্ময়কর এই গীতিকারের। প্রতিবেদককে তিনি শুনিয়েছেন না বলা যত কথা। যাতে মিশে আছে অর্জন, আক্ষেপ, অভিযোগ ও অভিমান। 

১৯৮৮ সালে ঢাকা আসেন দেহলভী। তখন কবিতা লিখতেন। গান লেখা শুরু জেমসের হাত ধরে। ১৯৯৬-৯৭-এর দিকে। সে গল্প শোনাতে গিয়ে বললেন, ‘‘ছোটবেলা থেকে কবিতা লিখতাম। গান লেখা শুরু শখে। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৯৯৬-৯৭-এর দিককার কথা। আমির হামজা নামে আমার এক ছাত্র ছিল। ওদের শান্তিনগরের বাসায় জেমস-আইয়ুব বাচ্চু প্র্যাকটিস করতেন। একদিন ওর মাধ্যমে জেমস ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। আমার লেখা কয়েকটি গান দেখাই। উনি পছন্দ করেন। প্রথম গান ছিল ‘যে পথে পথিক নেই।’’ 

james-baul

‘যে পথে পথিক নেই’ দিয়ে এক হয় জেমস-দেহলভীর পথ। দুজনে যেন পাতেন সুরের সংসার। সে সংসার ছেড়ে অন্য কোথাও যাননি উল্লেখ করে দেহলভী বলেন, ‘দুই-আড়াই বছর ছিলাম জেমস ভাইয়ের সঙ্গে। শুধু ওনার জন্য গান লিখতাম। সারাক্ষণ তার সঙ্গে থাকতাম। ঘুম ভাঙার পর থেকে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত। ওনার বাইরে আর কারও জন্য গান লেখা হয়নি। মেশাও হয়নি।’ 

ওই সময় দেহলভী লেখেন ‘জিকির’, ‘ঈশ্বর আছে’, ‘লুটপাট’, ‘সুলতানা বিবিয়ানা’, ‘হারাগাছের নূরজাহান’সহ জেমসের বেশকিছু কালজয়ী গান। সেগুলো ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’ অ্যালবামে বন্দি করেন গায়ক। আধ্যাত্মিক, ছন্নছাড়া, ও দ্রোহের কথায় সাজানো গানগুলো শুধু জেমসের ক্যারিয়ারেই নতুন মাত্রা দেয়নি। বাংলা ব্যান্ডের জন্যও ছিল আশ্চর্য সংযোজন। তবে ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’র সুখ উপভোগ করা হয়নি দেহলভীর। এ গীতিকারের কথায়, ‘‘তখন আমি মাস্টার্সের শেষ বর্ষের ছাত্র। ওই সময় ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’ অ্যালবাম বের হয়। খুব হিট হয় গানগুলো। রমরমা ব্যাপার। এরমধ্যে আমার পড়ালেখা শেষ হয়। কর্মজীবনে প্রবেশ করি। ঢাকা ছাড়তে হয়। নারায়ণগঞ্জ এক ফ্যাক্টরিতে চাকরি নিই। গানের সঙ্গে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।’’ 

দেহলভীর লেখা ‘সুষ্মিতার সবুজ ওড়না’ যখন বাংলা জুড়ে উড়ছিল, ‘লুটপাট’ হচ্ছিল সবাই, ভিড় জমছিল ‘সাহেব বাবুর বৈঠকখানা’য়, ‘যে পথে পথিক নেই’ সে পথও কানায় কানায় ভরে উঠছিল তখন তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নীরব প্রস্থানের। না গেলে কি হতো না— জানতে চাইলে বলেন, ‘‘চেয়েছিলাম গানকে পেশা হিসেবে নিতে। পড়ালেখা শেষে চেষ্টাও করেছিলাম। পরে দেখলাম সম্ভব না। কেননা অর্থ নেই। এক গান লিখলে ৫০০ টাকা দিত। ওই টাকায় জীবন চালানো-ই সম্ভব ছিল না। বিয়ে তো দূরের কথা। তাই ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’ হিট হওয়ার পরও ওই লাইনে হাঁটিনি। যদি সেভাবে সাপোর্ট পেতাম, যদি সংসার চালানো সম্ভব হতো তাহলে গান লিখেই চলতাম। গান প্রতি ৫০০০ করে দিলেও পেশা হিসেবে নিতে পারতাম।’’

আসাদুল্লাহ দেহলভী
আসাদুল্লাহ দেহলভী

সেটি সম্ভব হয়নি। ২৪ ঘণ্টা একসঙ্গে কাটলেও স্বার্থের উর্ধে উঠতে পারেনি গীতিকার-গায়কের সম্পর্ক। তাই রয়ে গেছে আক্ষেপ-অভিযোগ। বললেন, ‘কিছুটা আক্ষেপ তো আছেই। অভিযোগও যে নেই তা না। জেমসের সঙ্গে যেভাবে সময় দিয়েছি সেভাবে আর্থিক মূল্যায়ন তিনি করেননি। শুধু আমার সঙ্গে না। গিটারিস্ট, কিবোর্ডিস্ট, ড্রামারদের সঙ্গেও করেননি। ফান্টি, আসাদ, বাবু— তাদের সবারই অভিযোগ থাকার কথা। তবে শুধু যে জেমস একা দায়ী তা কিন্তু না। অন্য ব্যান্ডগুলোতেও একই ঘটনা ঘটেছে। ভোকাল ছাড়া বাকিরা বঞ্চিত হয়েছে। শুধু গীতিকার না, মিউজিশিয়ানরাও ঠিকমতো মূল্যায়ন বা পারিশ্রমিক পায়নি।’

এ গীতিকারের আক্ষেপ সিস্টেম নিয়েও। বললেন, ‘আমাদের দেশে সিস্টেমটাই নেই। এখন হয়তো হচ্ছে। তবে তখন রয়্যালিটি সিস্টেম ছিল না। থাকলে আমি কেন অনেকেই হয়তো গান লেখাকে পেশা হিসেবে নিতে পারতাম।’

গান ছেড়ে আর দশজনের জীবন বেছে নিয়েছিলেন গীতিকার। সে জীবনও যেন অনেকটা বোহেমিয়ানের। থিতু হতে দেয়নি কোথাও। উঠে এলো তার বর্ণনায়। তার কথায়, ‘২০০১ থেকে আমি গান থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রথমে চাকরি নিয়ে যাই নারায়ণগঞ্জ। সেখান থেকে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার। কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন, সিলেট। এভাবেই ঘুরে ঘুরে কাটছে। কোথাও এক বছর, কোথাও তিন বছর কোথাও পাঁচ বছর চাকরি করেছি। ২০১০ আসালে আসি নওগাঁ। এক যুগের বেশি হয়ে গেল। এখানে একটি এনজিওতে অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে আছি।’ 

দীর্ঘ চাকরি জীবনে গান থেকে দূরে থাকা তেমন একটা পোড়ায় না দেহলভীকে। তবে চিনচিনে ব্যথাটি রয়ে গেছে। বললেন, ‘অড়ালে থাকায় খারাপ লাগে না। তবে আমি গানটাকে পেশা হিসেবে নিতে পারলাম না। এজন্য খারাপ লাগে।’  

89371424d93cd87d86a3cd51ca8f24b7_0

কথায় আছে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। দেহলভীর ক্ষেত্রেও যেন তাই। এখনও মাঝে মাঝে লিরিক নাযিল হয় তার কলমে। সম্প্রতি জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী এসআই টুটুলের কণ্ঠে প্রকাশ পেয়েছে তার ‘নাচতে জানি না’ নামের একটি গান। জানালেন পর্যায়ক্রমে আরও কিছু গান আসবে। পাশাপাশি কবিতা লেখেন নিয়মিত। ইচ্ছা আছে কোনো এক বইমেলায় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের। 

এখনও দেহলভীর স্বপ্নজুড়ে গান। বললেন, ‘‘স্বপ্ন আছে কর্মজীবন থেকে অবসরে গেলে অনেক গান লিখব। কোনো পারিশ্রমিক নেব না। আমি মনে করি গানটা শখেই করা উচিত। পারিশ্রমিকের কথা এলে বাণিজ্যিক ব্যাপারটা চলে আসে। ফরমায়েশি গান লিখতে হয়। স্বাধীনতা হারায়, গানের মান থাকে না।’ জানালেন জেমস তাকে এই স্বাধীনতাটি দিয়েছিলেন। এমনকি কবি শামসুর রাহমানের ‘উত্তর’ কবিতা থেকে গানে রূপও পেয়েছে তার হাতে। বললেন, ’কবিতাটা গানের রূপ দিতে গিয়ে দুই-একটা শব্দ এদিক সেদিক করার প্রয়োজন ছিল। সেটা আমি করেছিলাম।’’ 

জেমসের হাত ধরে গান লিখতে এসেছিলেন দেহলভী। তারপর বহু বছরের বিচ্ছেদ। শুরুতে ফোনে হাই-হ্যালো হলেও এখান আর হয় না। তবুও যেন কোথাও একটা লেগে আছেন দুজন। কেননা জীবন নদীর বহু বাঁক ঘুরে দেহলভী আজ থিতু জেমসের পৈত্রিক শহর নওগাঁয়। মনে করিয়ে দিতেই ফোনের ও প্রান্তে এক চিলতে হাসির শব্দ। এ যেন সহজ স্বীকারোক্তি। 

আরআর