রাফিউজ্জামান রাফি
১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম
সংগীতে পথচলা অনেক দিনের। শ্রোতাদের মাঝে ‘উরাধুরা’ পরিচিতি মেলে ‘তুফান’ সিনেমার ‘লাগে উরা ধুরা’ গানের মাধ্যমে। অন্তরা রায় চৌধুরী হয়ে ওঠেন দেবশ্রী অন্তরা। ইউটিউবে ৩৭৯ মিলিয়ন বার দেখা গানটির গায়িকার সঙ্গে সম্প্রতি আলাপ জমে ঢাকা মেইলের।
দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা— নেতিবাচক শোনালেও দেবশ্রী অন্তরার গল্প ভিন্ন। গান ও করপোরেট খাত সামলেছেন সফলতার সঙ্গে। সম্প্রতি পথ বদলেছেন। ব্র্যাকের ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশনে সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছেন। বললেন, ‘এতদিন করপোরেট খাতে ছিলাম। প্রথমবারের মতো ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে কাজ শুরু করলাম। ব্র্যাকের ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশনে সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছি। এডুকেশন প্রোগ্রাম নিয়ে কাজ করব। অনেকদিন ধরে এই খাতে কাজের ইচ্ছা ছিল। এখানে কাজের অনেক সুযোগ আছে। অভ্যন্তরীণ পরিবেশ সহযোগিতাপূর্ণ। টিমওয়ার্কও দারুণ।’

চাকরি সামলাতে গিয়ে সুরের সঙ্গে সখ্যতায় মোটেও ঘাটতি হয়নি গায়িকার। গাইছেন নাটকে, দিচ্ছেন জিঙ্গেলে কণ্ঠ। তৈরি করছেন সলো ট্র্যাক। বললেন, ‘‘সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘লালপরী’ নামের একটি ফিকশনের থিম সং ‘মায়ার বাজার’ আমার গাওয়া। ওটার মিউজিক ভিডিও আলাদা করে রিলিজ হবে। ‘একগুচ্ছ নয়নতারা’ নামের আরেকটি নাটকে গেয়েছি। গানটির শিরোনাম ‘হঠাৎ ঝুম’। আমি আর মাহতিম সাকিব কণ্ঠ দিয়েছি। বেশ কিছু জিঙ্গেলও করেছি।’’
কথায় কথায় বোঝা গেল দেবশ্রীর সঙ্গে সিথানে পৈথানে শুধুই গান। করছেন শিশুতোষ রাইমস তথা ছড়াগান নিয়ে কাজ। তার কথায়, ‘ইংরেজি রাইমসের একটি প্রজেক্ট করছি। অনেকগুলো রাইমসের একটি সিরিজ বলতে পারেন। এরইমধ্যে দুটি করেছি। খুব ভালো লাগছে। কারণ কাজটি শিশুতোষ। শিশুদের ঘুমপাড়ানি গান।’ একরত্তিদের ঘুমপাড়ানি ছড়াগান করতে গিয়ে গায়িকাও ফিরে যাচ্ছেন শৈশবে। মায়ের কোলে ঘুমপাড়ানি গানের দিনগুলোতে। এ কারণেই প্রজেক্টটি নিয়ে বেশি আগ্রহী তিনি। বললেন, ‘এরকম কনটেন্ট আরও বানাতে চাই। যেন আমার বাচ্চারাও আমার কণ্ঠ এভাবে শুনতে পায়।’

আজকাল কাঁটাতারের ধার ধারছে না সুর। দেশের শিল্পীদের অনেকে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন। দেবশ্রীও নাম লিখিয়েছেন এরকম একটি প্রকল্পে। তার ভাষায়, ‘‘স্কাই’ নামে একটি গান করেছি। এটি ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্ট। সুর আমার। কথা ভাবনাও আমার। লিখেছেন অমিতা কর্মকার। তিনটি দেশ মিলে করছি। আমি গেয়েছি। সঙ্গে আছেন ইউক্রেন ও যুক্তরাজ্যের প্রডিউসার। গানটি ফেব্রুয়ারির দিকে করা। চলতি বছরই অডিও ভার্সন মুক্তি পাবে। বিবিসি রেডিও ইউকেতে (যুক্তরাজ্য) অন এয়ার হবে।’’ জানালেন, ‘স্কাই’য়ের পর নিজের কথা-সুরে সলো ট্র্যাক মুক্তি পাবে তার।
‘লাগে উরা ধুরা’ দিয়ে দেশ নেড়েচেড়ে দিয়েছিলেন দেবশ্রী। ওপার বাংলাসহ বিভিন্ন দেশের বাংলা ভাষাভাষীদের মুখে মুখে ফিরেছে গানটি। এরকম সরব গান দিয়েও তুলনামূলকভাবে নীরব গায়িকা। কারণ জানতে কৌতূহলী অনেকে। গায়িকা বললেন, ‘‘যখন ‘উরা ধুরা’ ফেমাস হয় তখন জুন মাস। তারপর জুলাই বিপ্লব। দেশে অস্থিরতা চলছিল। ফলে দেশ বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে শোয়ের ডাক পেলেও করিনি। এ কারণে হয়তো আমাকে সেভাবে পাননি শ্রোতারা। তবে গান ঠিকই করছি। দুই-তিনটি সিনেমায় কাজ করেছি। এরমধ্যে বড় আয়োজনের একটি মুভি রয়েছে। এতে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের কাজ করেছি। রেহান রাসুলের সাথেও একটি সিনেমায় গেয়েছি। সেটিও মুক্তি পায়নি। মুক্তির অপেক্ষায় আছি। ভালো কিছু হবে বলে আশাবাদী।’’
মঞ্চেও সরব দেবশ্রী। কাজ করছেন বেছে। সময় ও পরিবেশ অনুকূলে মনে হলেই স্টেজে মাইক্রোফোন হাতে নিচ্ছেন। সেইসঙ্গে চলছে চর্চা। বললেন, ‘আজকাল শো করছি। খুব বেশি না। যেগুলো করার মতো মনে হচ্ছে। প্র্যাকটিস করছি। এই বছর কনসার্টে ফোকাস করব। যেহেতু আমি বিভিন্ন পেশায় আছি তাই সব সামলে শো করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ভালো কিছু হলে নেওয়ার চেষ্টা করি।’

সংগীত অঙ্গনের অনেকে সিন্ডিকেট নিয়ে অভিযোগ তোলেন। কারও দাবি, সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিভাবানরা ভালো কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায় না। তবে দেবশ্রীর কাছে সিন্ডিকেটের টাইম নেই। তার স্পষ্ট বার্তা, ‘আমি কখনও সিন্ডিকেট মেইনটেইন করিনি। করার টাইমও নেই। তাই এ ব্যাপারে বলতে পারব না। তবে যাদের সঙ্গে কাজ করেছি তারা দেশের প্রথম সারির সুরকার ও সংগীত পরিচালক। যেমন হাবিব ওয়াহিদ, আরাফাত মহসীন নিধি, প্রীতম হাসান, আপেল মাহমুদ এমিল প্রমুখ। তাদের সঙ্গে কাজ করতে আমাকে সিন্ডিকেট মেইনটেইন করতে হয়নি। মেধাই অগ্রাধিকার পেয়েছে। আমি মনে করি যারা সিন্ডিকেট করে তাদের কাজগুলো নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সঙ্গে হয়। আমি কিন্তু তা না। হাবিব ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করেছি। নতুনদের সঙ্গেও করছি। এমন অনেক প্রডিউসারদের সঙ্গে কাজ হয়েছে যারা প্রথম গান বানাচ্ছে। এতে আপত্তি নেই। গান ভালো হলেই হলো। আমি বিশ্বাস করি যাদের মেধা আছে তারা সিন্ডিকেটের চক্করে পড়ে না।’
বিভিন্ন ভাষায় গাইতে চান দেবশ্রী। আছেন সময়-সুযোগের অপেক্ষায়। বললেন, ‘আমি বিভিন্ন ভাষায় গাইতে পছন্দ করি। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কোলাবরেট করা আমার স্বপ্ন। সুযোগ ও সময়ের অপেক্ষায় আছি। সেইসঙ্গে ভালো গান করতে চাই। নিজের অনেক গান রয়েছে। যেগুলো করতে অর্থায়ন প্রয়োজন। এজন্য প্রযোজনা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলতে হবে। ব্যাটে-বলে মিললেই গানগুলো আসবে।’

বাবার গৃহে আসছেন দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা। ঢাকের বোল, শাঁখের ধ্বনি, কাসার থাল বেজে ওঠা সময়ের অপেক্ষা মাত্র। পূজা দোল দিয়েছে দেবশ্রীর মনেও। এরইমধ্যে কেনাকাটা সেরেছেন। ৬০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মণ্ডপে পূজা উদযাপন করবেন তিনি। তার কথায়, ‘আমার পূজার শপিং অলরেডি ডান। তবে পূজা আসা পর্যন্ত প্রত্যেক দিন কিছু না কিছু কেনা হয়। চাঁদপুর শাহারাস্তিতে আমাদের নিজেদের বাড়িতে পূজা হয়। এটি রায়চৌধুরীদের ৬০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মণ্ডপ। ছোটবেলা থেকে ওখানেই পূজা করি। এবারই ব্যতিক্রম হবে না।’
সম্প্রতি নারীর প্রতি সহিংসতা আশংকাজনকভাবে বেড়েছে। গায়িকা মনে করেন এরকম পরিস্থিতিতে নারীদের সচেতনতা জরুরি। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে যে পরিস্থিতি তাতে বুঝেশুনে চোখ কান খোলা রেখে চলা দরকার। নারীদের অনেক কিছু চিন্তাভাবনা করে চলতে হয়। তার পোশাক কী হবে, কোন জায়গায়, কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে— তার ওপর একজন নারীর সম্মান নির্ভর করে।‘

দেবশ্রী মনে করেন দেশের এমন কোনো নারী নেই যাকে হেনস্তার শিকার হতে হয়নি। রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও। বললেন, ‘বাংলাদেশে এমন কোনো নারী নেই যে কখনও মলেস্ট বা হয়রানির শিকার হয়নি। আমিও হয়েছি। এমন একটি দেশে বাস করি যেখানে নারীদের এভাবেই দেখা হয়। এটা রাতারাতি বদলাবে না। হেনস্তার শিকার হয়ে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করলে বরং বাড়বে।’ এরকম পরিস্থিতিতে গায়িকা মনে করেন বুঝেশুনে চলা উচিত। পাশাপাশি নারীর প্রতি পুরুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারিবারিক শিক্ষারও প্রয়োজনীয়তা আছে।
আরআর