Dhaka Mail Logo

বিনোদন

সমস্যার শেষ নেই ঢাকা সিটি করপোরেশনের সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে

রাফিউজ্জামান রাফি

১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম

মাস খানেক আগে এক সংগীতশিল্পীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। জানালেন তিনি সমাজের অনগ্রসর শিশুদের সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এরকম ১৭টি সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র। ৫টি উত্তরে এবং ১২টি দক্ষিণে। ভর্তি ফি ২৫০ টাকা। মাসে বেতন ১০০ টাকা। দুর্মূল্যের বাজারে এত স্বল্প খরচে নাচ-গান শেখার সুযোগ যেন অলীক কল্পনা। তাই আগ্রহ জন্মায়। 

এক গনগনে দুপুরে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ি। গন্তব্য বাসাবো সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের সংগীত শিক্ষা কেন্দ্র। যথাস্থানে পৌঁছেও খটকা লাগছিল। কেননা আশাপাশে দেখছিলাম না কোনো সাইনবোর্ড বা ব্যানার। ততক্ষণে ওই কেন্দ্রের এক শিক্ষকের সঙ্গে দেখা। জানালেন শুধু বাসাবো না, অধিকাংশ কেন্দ্রে-ই সাইনবোর্ড না থাকায় সামনে দিয়ে গেলেও সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রগুলোর অস্তিত্ব বোঝার উপায় নেই। জানা গেল, রয়েছে আরও হরেক রকম প্রতিবন্ধকতা। প্রচারণার অভাব, দেওয়া হয় না সার্টিফিকেট, জায়গা সংকট, অনুপযুক্ত পরিবেশ, শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার কম, করপোরেশনের উদাসীনতা, কয়েকটি কেন্দ্রের কার্যক্রম স্থগিত। রয়েছে বৈষম্যও। সেসব উঠে ঢাকা মেইলের প্রতিবেদনে। সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রগুলোর সমস্যাগুলো নিয়ে কথা হয়েছে দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গেও। তিন পর্বের প্রতিবেদনের শেষ পর্বে থাকছে করপোরেশনের বক্তব্য। আজ প্রকাশ পেল প্রথম পর্ব।

অধিকাংশ কেন্দ্রেই নেই সাইনবোর্ড l ছবি: ঢাকা মেইল
অধিকাংশ কেন্দ্রেই নেই সাইনবোর্ড l ছবি: ঢাকা মেইল  

 

সাইনবোর্ড নেই

সরেজমিনে পরিদর্শন করে এবং কথা বলে জানা গেল কারওয়ান বাজার আব্দুল হামিদ কমিউনিটি সেন্টার এবং রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টার কেন্দ্রের সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রে সাইনবোর্ড রয়েছে। আর কোনো কেন্দ্রে নেই। মিরপুরের ২ নং ওয়ার্ড কমিউনিটি সেন্টারের সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রে সাইনবোর্ড থাকলেও চোখে পড়ে না। শিক্ষক শিখা কর্মকার (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমাদের সাইনবোর্ড এমনভাবে টাঙানো যে লোকজন দেখেও না। সামনে দিয়ে গাড়ি-ঘোড়া থাকে। বড় সাইনবোর্ড হলে ভালো হতো। এক বছর আগে দেবে বলেছিল। আজও পাইনি।’ মহাখালী কমিউনিটি সেন্টারের সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রের সাইনবোর্ড নামিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানকার শিক্ষক রাবেয়া হাসান (ছদ্মনাম) বললেন, ‘গেল বছর ছায়ানটে হামলা ও আগুন দেওয়া হয়। তখন আতংকে সাইনবোর্ড নামিয়ে ফেলি। তবে এরইমধ্যে বড় করে সাইনবোর্ড বানাতে দিয়েছি।’ ফকির চাঁন (নারিন্দা) সরদার সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক নলিনী দাস (ছদ্মনাম) বলেন, ‘সাইনবোর্ড না থাকায় বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই এখানে গানের স্কুল আছে।’ বাকি কেন্দ্রগুলোতেও সাইনবোর্ডের অস্তিত্ব পাওয়া গেল না। তবে শিক্ষকরা প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। মহানগর মহিলা কলেজ সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক রাবেয়া হাসান (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমাদের একটি সাইনবোর্ড দরকার। আগেরটি নেই।’ যাত্রাবাড়ী সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রে দেয়ালে লেখা একটি সাইনবোর্ড রয়েছে। করপোরেশনের উদাসীনতার উদাহরণ পাওয়া গেল হাজী জুম্মন সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক মাহবুব আলমের (ছদ্মনাম) কথায়। তিনি বলেন, ‘প্রচারণা নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেই করপোরেশনের। সাইনবোর্ড চাইলে বলে লাগান। কিন্তু খরচটা দেবে কে?’ প্রশ্ন রাখেন এই শিক্ষক।

যাত্রাবাড়ী সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রে দেয়ালে লেখা সাইনবোর্ড-ই ভরসা l ছবি: ঢাকা মেইল
যাত্রাবাড়ী সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রে দেয়ালে লেখা সাইনবোর্ড-ই ভরসা l ছবি: ঢাকা মেইল


প্রচারণার অভাব

স্বল্প খরচে নাচ-গান শেখার সুযোগ সত্ত্বেও কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশানুরূপ না। জানা গেল, এর অন্যতম কারণ প্রচারণার অভাব। আগে সিটি করপোরেশন থেকে লিফলেট বিতরণ করা হতো। অনেক বছর ধরে সেটি বন্ধ। যাত্রাবাড়ী কেন্দ্রের সংগীত শিক্ষক শাফায়েত আলী (ছদ্মনাম) বলেন, ‘অনেক বছর আগে একবার লিফলেট দিয়েছিল। সেগুলো আশেপাশের স্কুলে বিলি করায় ইতিবাচক ফল পাই। পরে আর দেওয়া হয়নি। প্রচারণাও চালাতে পারছি না।’ মহানগর মহিলা কলেজ কেন্দ্রের চিত্রও একই। সেখানকার শিক্ষক রাবেয়া হাসান বলেন, ‘কয়েক বছর আগে করপোরেশন থেকে লিফলেট দিয়েছিল। সেগুলো কয়েক বছর বিলি করেছি। আর দেওয়া হয় না।’ বাকি কেন্দ্রগুলোতেও প্রচারণা কার্যক্রম নেই বলে জানালেন সংশ্লিষ্ট শাখার শিক্ষকরা। তবে শিক্ষকদের কেউ কেউ নিজ দায়িত্বে প্রচারণা চালান। রাবেয়া হাসান বলেন, ‘বছরের শুরুতে আশেপাশের স্কুলগুলোতে যাই। অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলি। নিজ উদ্যোগে প্রচারণার কাজ সারি। শুধু কারওয়ার বাজার কেন্দ্রে সদ্য প্রকাশিত লিফলেট পাওয়া গেল।

মেলে না সার্টিফিকেট 

সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রগুলোর বয়স দুই দশকের বেশি। কিন্তু কয়েকটি কেন্দ্র বাদে শিক্ষার্থীদের হাতে সনদপত্র তুলে দিতে পারেনি কেউ। মিরপুর ও মহাখালী কেন্দ্রে চলতি বছর প্রথমবার দেওয়া হয়েছে সনদপত্র। বছর চর-পাঁচেক আগে সূচনা কমিউনিটি সেন্টার সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রে একবার দেওয়া হয়েছিল। গেল বছর কারওয়ান বাজার কেন্দ্রে দেওয়া হয়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলো প্রতিষ্ঠার পর একবারও সনদপত্র তুলে দিতে পারেনি শিক্ষার্থীদের হাতে। ফলে অনেকেই স্কুলমুখো হচ্ছে না বলে জানালেন মহাখালী কেন্দ্রের শিক্ষক মিথিলা ইসলাম (ছদ্মনাম)। বললেন, ‘১৫ বছরে একবার সার্টিফিকেট দিয়েছে আমাদের এখানে। সার্টিফিকেট দেয় না বলে ছাত্র-ছাত্রীরা চলে যাচ্ছে।’ সনদপত্রের বিকল্প হিসেবে কোনো কেন্দ্রে সমাজকল্যাণের প্যাডে দেওয়া হচ্ছে প্রত্যয়ন পত্র। হাজী জুম্মন সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক মাহবুব আলম বলেন, ‘আমাদের এখানে একবারও সার্টিফিকেট দেওয়া হয়নি। কারও প্রয়োজন হলে সমাজকল্যাণের প্যাডে প্রত্যয়ন পত্রের মতো দিয়ে কাজ চালাই।’

যাত্রাবাড়ী সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র: শ্রেণিকক্ষের বাইরে অপরিচ্ছন্ন মেঝেতে শেখানো হচ্ছে নাচ l ছবি: ঢাকা মেইল
যাত্রাবাড়ী সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র: শ্রেণিকক্ষের বাইরে অপরিচ্ছন্ন মেঝেতে শেখানো হচ্ছে নাচ l ছবি: ঢাকা মেইল  

অনুপযুক্ত পরিবেশ ও জায়গা সংকট

সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর যেন সর্বাঙ্গে ব্যধি। কোনোটাই গুরুতর কম না। এরমধ্যে অন্যতম অনুপযুক্ত পরিবেশ ও জায়গা সংকট। নেই শিক্ষকদের আলাদা বসার কক্ষ। মিরপুরের শাখাটি পুরনো ভবনের তিন তলায় অবস্থিত। শিক্ষক শিখা বলেন, ‘আলো বাতাস তেমন আসে না। ভ্যাপসা গরম। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। শিক্ষার্থীরা স্বস্তিতে ক্লাস করতে পারে না। অভিভাবকদেরও নেই বসার উপযুক্ত জায়গা।’। মহাখালী কেন্দ্রের পরিবেশও উপযুক্ত না বলে জানালেন রাবেয়া হাসান। বললেন, ‘তিন তলায় ক্লাস হয়। প্রচুর গরম। বাচ্চাদের কষ্ট হয়। এসি দিতে চেয়েছে। দেড় বছরেও দেয়নি। আমাদের খোলামেলা জায়গা দরকার। সূচনা কমিউনিটি সেন্টারে অবস্থিত কেন্দ্রের ক্লাস হয় এক তলায়। ভেতরের পরিবেশ তুলনামূলক ভালো। তবে বাইরের পরিবেশ অনুপযুক্ত বলে জানালেন শিক্ষক সূচনা (ছদ্মনাম)। বললেন, ‘কক্ষ আগে অগোছালো ছিল। এখন ঠিকঠাক। তবে যাতায়াতের রাস্তা ভালো না। বাইরের পরিবেশ অনুপযুক্ত।’ জায়গা সংকট ও উপযুক্ত পরিবেশের অভাব কারওয়ান বাজারের আব্দুল হামিদ কমিউনিটি সেন্টারের কেন্দ্রেও। শিক্ষক কোহিনুর ইসলাম (ছদ্মনাম) বললেন, ‘কমিউনিটি সেন্টারে বিভিন্ন সরকারি কাজ চলে। আমাদের ক্লাস হয় সচিবের কক্ষে। শুক্রবার ছুটির দিন বলে সমস্যা হয় না। কিন্তু বৃহস্পতিবার খোলা থাকে। সেদিন সচিবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে। তিনি আমাদের জন্য দুপুর ২টায় চলে যান। নিজস্ব জায়গা থাকলে। সমস্যাগুলো হতো না। রায়ের বাজারের কেন্দ্রটির সংকট যেন আরও। শিক্ষক সুব্রত হাওলাদার (ছদ্মনাম) বলেন, ‘শিক্ষকদের আলাদা জায়গা নেই। তাছাড়া কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠান থাকলে হইচইয়ে ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। তখন আমরাও বসার জায়গা পাই না। যাত্রাবাড়ী কেন্দ্রের পরিবেশ গুমোট। ঢুকতেই নাক কুঁচকে গেল ভ্যাপসা গন্ধে। গানের ক্লাসরুম অপরিচ্ছন্ন, পুরনো দুটি আলমারি আর চেয়ারের স্তুপ দেখে অনেকটা স্টোররুমের মতো মনে হলো। সেখানেই চলে সংগীত শিক্ষা। শিক্ষকরাও বসেন কক্ষটিতে। বাইরে খোলা স্থানে অপরিষ্কার মেঝেতেই নাচের ক্লাস হচ্ছে। ধলপুর কমিউনিটি সেন্টার কেন্দ্রে কক্ষগুলো বড় হলেও ধুলার আস্তর পড়েছে মেঝেতে। পরিষ্কার করবে এমন কেউ নেই। সেখানেই নাচ ও গান শিখছে একরত্তিরা।

ধলপুর সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র: অভিবাবকদের নেই আলাদা বসার স্থান l ছবি: ঢাকা মেইল
ধলপুর সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র: অভিবাবকদের নেই আলাদা বসার স্থান l ছবি: ঢাকা মেইল

 

জানা গেল দুই-একটি বাদে বাকি কেন্দ্রগুলোও অনুপযুক্ত পরিবেশে ভুগছে। এ অবস্থায় শিক্ষকরা অনুভব করেন নিজস্ব জায়গার প্রয়োজনীয়তা।  বাসাবো সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষক আশকর আলম (ছদ্মনাম) জানালেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করায় স্কুলটি নিকটস্থ দেব মন্দিরে স্থানান্তর করা হয়। জায়গা বদলের ফলে ছাত্র-ছাত্রী কমে যায়। নিজস্ব জায়গা থাকলে এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো না। বাকি কেন্দ্রের শিক্ষকরাও জায়গা সংকট ও অনুপযুক্ত পরিবেশের কথা জানলেন।

চলবে...

আরআর