Dhaka Mail Logo

বিনোদন

বেগম আখতার: হারেম থেকে পদ্মভূষণ, বাইজি থেকে গজলের রানি হয়ে ওঠার গল্প

বিনোদন ডেস্ক

০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম

রূপালি পর্দার আলো ঝলমলে দুনিয়া থেকে দূরে, ব্যক্তিগত জীবনের নানা দুঃখ-কষ্ট ও বঞ্চনাকে গানের সুরে জীবন্ত করে তুলেছিলেন পদ্মভূষণ প্রাপ্ত বেগম আখতার। তিনি ছিলেন ভারতীয় মার্গসংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাইজি পরিবারের জন্ম এক সাধারণ কিশোরী থেকে শুরু করে লখনউয়ের নবাবের স্ত্রী। সেখান থেকে গজলের রানি হয়ে ওঠার পথটি সহজ ছিল না; বরং তা ছিল ভীষণ কঠিন ও বেদনায় ভরা।

আখতারির জীবনের সঙ্গে কলকাতা শহর নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল। তাঁর জীবনের প্রথম স্টেজ অনুষ্ঠান এই শহরে। এক শিল্পী শেষ মুহূর্তে আসেননি, ফলে হঠাৎ করেই স্টেজে তুলে দেওয়া হয় অল্পবয়সী আখতারিকে। স্মৃতিচারণে আখতারি বলেছিলেন, ‘আমি এর আগে কখনও স্টেজে অনুষ্ঠান করিনি৷ এত মানুষ স্টেজের উপর থেকে দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল, বোধ হয় অজ্ঞান হয়ে যাব৷ একটু বেশি ক্ষণ সময় নিয়েছিলাম গান ধরতে৷ সে সময় আল্লাহকে বলেছিলাম, শক্তি দিতে৷ মুমতাজ বেগমের গাওয়া আমার সব চেয়ে প্রিয় ওই গজল দিয়েই অনুষ্ঠান শুরু করি৷ গলা ফেলার পর অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলাম৷’

স্টেজ থেকে নামতে না নামতেই তাঁকে ঘিরে ধরেন কিছু গুণমুগ্ধ৷ তাঁদের মধ্যে একজন বলেছিলেন, ‘আমি এখানে আসার সময় ভেবেছিলাম, কিছু ক্ষণ থেকে চলে যাব৷ কিন্তু তুমি আমাকে গোটা অনুষ্ঠান বসে থাকতে বাধ্য করলে৷ আমি আজ তোমার অনুষ্ঠান শুনলাম৷ তুমি আগামী কাল আসবে আমার অনুষ্ঠানে।’ বক্তার নাম ছিল সরোজিনী নাইডু। যিনি পরের দিন একটি খাদির শাড়ি উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন তরুণী আখতারিকে। গান গেয়ে সেটাই ছিল তাঁর জীবনে পাওয়া প্রথম কোনো উপহার।

১৯১৪ সালে ফৈজাবাদ জেলার এক অখ্যাত শহরে জন্ম হয় তাঁর। মা মুস্তারির প্রেমে পড়েছিলেন লখনউয়ের আইনজীবী আসগর হুসেন। হুসেনের দ্বিতীয় স্ত্রী মুস্তারি নিজেও ছিলেন এক তওয়াইফ। বিয়ের কিছু দিন পর মুস্তারি ও তাঁর মেয়েদের তাড়িয়ে দেন আসগর। অগত্যা মেয়েদের নিয়ে মুস্তারি চলে আসেন ফৈজাবাদে।

আখতারির জীবনের এটাই ছিল প্রথম বিচ্ছেদ। বাবাকে জীবনভর খুঁজে গিয়েছেন তিনি। মা এবং যমজ বোনের সঙ্গে শুরু হয় বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই। এই লড়াইয়ের মধ্যে আসে দ্বিতীয় আঘাত। তখন বয়স মাত্র চার। বিষ মেশানো মিষ্টি খেয়ে হাসপাতালে নেওয়ার আগে মারা যায় তাঁর ছোট বোন জোহরা। ছোট্ট বিব্বি (আখতারি) তার সব সময়ের সঙ্গীকে খুঁজে যায়, কিন্তু পায় না। মাকে বারবার জিজ্ঞাসা করে বোনের কথা। মা সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, ‘বোন গিয়েছে আল্লাহের বাড়ি...।’ বহু দিন পর্যন্ত আখতারি জানতই না, বোন সত্যিই কোথায় চলে গেছে।

পরবর্তী সময়ে তাঁর এক গুরুর কাছে প্রতারণার শিকার হতে হয় তাঁকে। ঘনিষ্ঠ এক ছাত্রীর লেখা থেকে জানা যায়, ভারতীয় মার্গসংগীতের স্বনামধন্য সেই শিল্পী পরমা সুন্দরী আখতারিকে দেখে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি। তারও পরে বিহারের এক প্রদেশের সংগীত পৃষ্ঠপোষক রাজার লালসার শিকার হতে হয় তাঁকে। ফলস্বরূপ জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান। লোকলজ্জার হাত থেকে ছোট্ট আখতারিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন মা মুস্তারি। তিনি চারদিকে চাউর করে দেন যে, নবজাতিকাটি তাঁরই আত্মজা। আমৃত্যু সেই মেয়েকে বোন বলে ডেকে গিয়েছেন আখতারি। অথচ তখন তাঁর নিজের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর!

পরে লখনউয়ের ব্যারিস্টার ও কাকলির নবাব ইশতিয়াক আহম্মদ আব্বাসি তাঁকে বিয়ে করলে, অযোধ্যার উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে আখতারি এক নতুন মর্যাদায় ভূষিত হন। বাইজি থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বেগম আখতার।

নবাবের সঙ্গে অবশ্য তাঁর পরিচয় হয়েছিল বেশ অদ্ভুতভাবে। ১৯৩৪ সালে লখনউয়ের রাস্তায় দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন আখতারি। আব্বাসি তখন এক তরুণ আইনজীবী। আখতারির গাড়ি তাঁকে প্রায় চাপা দিয়েই ফেলেছিল। কোনো রকমে সে যাত্রা রক্ষা পান নবাবজাদা। এর পর দীর্ঘ আলাপের মাধ্যমে জন্ম নেয় প্রেম। ক্রমে আখতারির জাদুকরি গানে মজে যান তিনি। শেষ পর্যন্ত পরিণয় ঘটে তাঁদের।

বেগম আখতার হওয়ার পর বিয়েতে একটি কঠোর শর্ত চাপানো হয়েছিল— তিনি সাধারণ কোনো আসরে গান গাইতে পারবেন না। তিনি তা মেনেও নিয়েছিলেন। হয়তো তিনিও চেয়েছিলেন একেবারে ঘরোয়া জীবন ও গ্ল্যামার থেকে সম্পূর্ণ বিরতি। কিন্তু ক্রমেই অন্দরমহলের চার দেওয়ালে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন বেগমসাহেবা। বছরকয়েক এভাবে কাটার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, কোনো ওষুধে এই রোগ সারবে না; তাঁকে গানে ফেরাতে হবে।

১৯৪৯ সালে লখনউ রেডিওয় তিনটি গজল ও একটি দাদরা রেকর্ড করেন তিনি। অল ইন্ডিয়া রেডিওয় ব্রডকাস্টের সময় তাঁকে ‘বেগম আখতার’ বলে সম্বোধন করা হয়। রেকর্ডিং শেষে বাড়ি ফিরে অঝোরে কেঁদেছিলেন তিনি।

চলচ্চিত্র জগতেও তাঁর অবদান কম না। তিনের দশকের কলকাতার ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম কোম্পানি তাঁকে ‘একদিন কা বাদশা’ ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেয়। এর পর ‘আমিনা’, ‘রূপ কুমারী’-সহ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। পরে লখনউ ফিরে আসেন। ১৯৪২ সালে পরিচালক মেহবুব খান তাঁকে ‘রোটি’ ছবিতে অভিনয় ও গান করার কথা বললে আখতারি রাজি হন। সেই ছবির সুরকার ছিলেন অনিল বিশ্বাস।

কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘জলসাঘর’ ছবিতে জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের গান শোনার দৃশ্যপটের জন্য এক সত্যিকারের বাইজির খোঁজ করছিলেন। উস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ ও তাঁর ছোট ভাই ইমরাত খাঁ সংগীত পরিচালনা করতে গিয়ে বুঝেছিলেন, আখতারি ছাড়া আর কারও কথা ভাবাই যায় না। সত্যজিৎ রায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা লখনউ গেলাম। ওঁকে বললাম। শুরুর দিকে উনি রাজি হননি। আমার এক আত্মীয় তখন লখনউয়ের ব্যারিস্টার। উনি আখতারির স্বামীর ভালো বন্ধু। শেষে উনিই রাজি করান।’

কাকার ইচ্ছেতেই মাত্র সাত বছর বয়সে তাঁর গান শুরু হয়। নাটকে অভিনয়ের সূত্র ধরে কলকাতায় আসা। নাটকের পাশাপাশি জলসাতেও গান করতেন। কলকাতায় থাকাকালীন অর্থকষ্ট থেকে মুক্তি পেতে তাঁকে প্রথম রেকর্ডিং করতে হয়েছিল। এইচএমভির হয়ে আখতারির প্রথম কিছু গজল ও ঠুংরি রেকর্ড করা হয়, যার মধ্যে একটি গজল ছিল ‘বো আসীরে দাম-এ-বলা হুঁ ম্যায়’। এই গান এতটাই জনপ্রিয়তা পায় যে তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

সেটা ১৯২৫ সাল। বিভিন্ন জলসায় গান-রেকর্ডিং চলছে, আখতারি মনস্থির করলেন যে তিনি পেশাদার সংগীতশিল্পী হবেন। একদিন মাকে সে কথা বলায় মা ভীষণ চিন্তায় পড়ে যান। আখতারিকে নিয়ে তিনি যান বরেলি শরিফে এক সুফি পীরের কাছে। পীরবাবাকে সবটা জানিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা বলেন, কারণ তখন মেয়ে বিবাহযোগ্যা। পীরবাবা একটি বিশেষ গান বেছে দেন এবং পরবর্তী অনুষ্ঠান ওই গজল দিয়ে শুরু করতে নির্দেশ দেন। সেই গজলটি ছিল ‘দিওয়ানা বানানা হ্যায় তো, দিওয়ানা বানা দে।’ এইচএমভি গানটি রেকর্ড প্রকাশ করলে শ্রোতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। 

ঘনিষ্ঠ ছাত্রীর লেখা থেকে জানা যায়, মানসিক যন্ত্রণা এড়াতে তাঁকে বেশ কয়েকবার গর্ভপাতও করতে হয়েছিল। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরও ভাঙতে শুরু করে।

১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর। আমদাবাদে একটি অনুষ্ঠান নিয়ে চারদিকে মারাত্মক উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। বেগম সাহেবার ৬০ বছরের জন্মদিনের বিশেষ অনুষ্ঠান ছিল সেটি। বেগম নিজেও সেই অনুষ্ঠান নিয়ে দারুণ উত্তেজিত ছিলেন। যদিও তাঁর শরীর একেবারেই ভালো ছিল না; ইতিপূর্বে দুইবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। শরীর দুর্বল, তার ওপর জ্বর— তবু আগ্রহের কমতি ছিল না। কবি কাইফি আজমি তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে একটি বিশেষ গজল লিখেছিলেন, সেই গানও তাঁকে গাইতে হবে।

ভিড়ে ঠাসা অডিটোরিয়াম। পর্দা ওঠামাত্র দর্শক হাততালিতে তাঁকে অভিবাদন জানানো হয়। একের পর এক অনুরোধে জনপ্রিয় সব গান গাইতে হয়। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে এল আরও একটি গানের অনুরোধে। গান শুরুর একটু পরেই মঞ্চে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়েন। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে ভর্তির তিন দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

গত ৭ অক্টোবর ছিল অমর শিল্পীর ১১২তম জন্মদিবস। 

তথ্য সূত্র: আনন্দবাজার. কম