Dhaka Mail Logo

বিনোদন

যে ঘরটায় আছি তার জানালা খুললেই থই থই পানি: রুনা খান  

রাফিউজ্জামান রাফি

২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম

গল্পের প্রয়োজনে বিভিন্ন বেশ ধারণ করেন রুনা খান। প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙেচুরে দাঁড়ান ক্যামেরায়। এবার হয়েছেন ‘জলপবনে’র নিরালা। শুটিংয়ে অংশ নিতে সাময়িক বাসা বেঁধেছেন হাওরে। লাইট-ক্যামেরার ফাঁকে অভিনেত্রীরে চোখে জলভরা হাওর ধরা দেয় যৈবতী কন্যার রূপে। যার ভাঁজে ভাঁজে সেখানকার মানুষজনের সুখ ও সংগ্রাম। ঢাকা মেইলকে সে গল্প শুনিয়েছেন রুনা খান।

এর আগে শীত মৌসুমে রুনা খান শুনেছিলেন বর্ষায় হাওর নাকি হয়ে ওঠে অষ্টাদশী। এবার সেই রূপ চোখের সামনে। মুগ্ধ অভিনেত্রী। বললেন, ‘এর আগে শীতকালে সুনামগঞ্জে শুটিং করেছি। তখন শুনেছি বর্ষাকালে পানি থাকে৷ কিন্তু ধারণা ছিল না। পানির সময় হাওরে এবার প্রথম এলাম। চারদিক থই থই করছে। ধানক্ষেতগুলো তলিয়ে গেছে। আমরা যেখানে থাকছি সেখান থেকে মেঘালয় দেখতে পাওয়া যায়। যেদিন একটু রৌদ্রোজ্জ্বল থাকে সেদিন অদ্ভুত সুন্দর লাগে।’ 

780748681_10243756770395479_3554739288335951703_n

কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার গানে লিখেছিলেন জ্যোৎস্না রাতে ঘর থেকে বের হলেই চাঁদের আলো হাত ভরায়। আর বর্ষার হাওরে জানালা খুললেই রুনার মন ভরায় থই থই জল। সে অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমি যে ঘরটায় আছি তার জানালা খুললেই থই থই পানি৷ কী যে সুন্দর! বলে বোঝানো সম্ভব না। স্বচক্ষে দেখার ও উপভোগ করার ব্যাপার। এখানে এসে মনে হচ্ছে, দেশে এত সুন্দর সুন্দর জায়গা, বৈচিত্রময় প্রকৃতি! যদি একটু যত্নবান হওয়া যেত তবে জায়গাগুলো পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে নাম করত। বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসত।’

রুনা জানালেন, হাওরবাসীদের বাড়িগুলো যেন অল্প জমির ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা একেকটা ছোটখাট পর্বত। তবে জলের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার এ কৌশল যেন বাড়িয়ে তোলে রাতের হাওরের সৌন্দর্য। বললেন, ‘এখানকার প্রায় প্রত্যেক পরিবারেরই আবাদি জমি প্রচুর। কিন্তু বাড়িগুলো অল্প জমির ওপর। পাঁচ থেকে দশ শতাংশের বেশি না৷ সেগুলোও মাটিতে থেকে নুন্যতম ১৫-২০ ফিট উঁচু। কারওটা আরও। বর্ষায় যখন চারদিকে থই থই পানি তখন বাড়িগুলোকে মনে হয় ছোট ছোট দ্বীপ। আমি যে বাড়িতে আছি সেটা একতলা। পুরো গ্রামে এই একটি-ই বিল্ডিং। ছাদে গিয়ে দাঁড়ালে মনে হয় পানির মাঝে ছোট্ট সবুজ গ্রামগুলো ভেসে আছে।’

784351516_10243823177535616_4737230121282733659_n

শুটিংয়ের ফাঁকে হাওরের জলের সঙ্গে সখ্যতা জমে অভিনেত্রীর। দুজনের সৌন্দর্য হয় মিলেমিশে একাকার। বাকি অবসরে নিজেকে সঁপে দেন বইয়ে। বললেন, ‘অবসর কাটে বইয়ের সঙ্গে৷ জানলার কাছে বসলে বাতাস আসতে থাকে। ছোট গল্পের পাতা উল্টাই। মনে হয় যেন স্বপ্নের কোনো জগতে আছি! গত সাত দিনে আমার বরকে অন্তত ১০ বার ফোন করে বলেছি, আমি রিটায়ার করে এখানে এসে থাকতে চাই। আমাকে এখানে জমি কিনে দাও। মাটি তুলে বাড়ি করব। বর ভাবছে, আমি খেয়ালি মানুষ। জায়গাটা খুব ভালো লেগেছে। তাই বলছি৷ কিন্তু এটা সত্যি হতেও পারে।’ বোঝা যায় হাওরে মন মজেছে অভিনেত্রীর।’

স্বচ্ছ জল, বিশুদ্ধ বাতাসের পাশাপাশি অভিনেত্রীকে দু’দণ্ড শান্তি দিয়েছে হাওরের তাজা মাছ। তার কথায়, ‘আসার পর থেকে মাছের ওপর আছি। নানা রকমের মাছ এখানে। ট্যাংরা, পুটি থেকে শুরু করে সব। পানি যখন কমে আসে তখন বোয়াল রুইসহ বড় বড় মাছ পাওয়া যায়। আসার পরদিন থেকে বলা শুরু করেছি বাসায় মাছ নিয়ে যাব। আমার মেয়ে ছোট মাছ খুব পছন্দ করে। এরইমধ্যে আমার জন্য মাছ সংগ্রহ শুরু হয়ে গেছে। একজন বলে রেখেছে ঢাকা ফেরার দিন মাছ দেবে।’

783830793_10243801839682183_4111424766592843053_n

অভিনেত্রী জানালেন, তারা যেখানে শুটিং করছেন সেখানকার মানুষজন খুবই সহযোগিতা পরায়ণ। সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও এগিয়ে। অনেকেই থিয়েটার করেন। যাত্রা, কীর্তনের সঙ্গে যোগ আছে। চাষবাষ করলেও নানা রকম সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়ে যান তারা। 

ক্যামেরার চোখে বিভিন্ন রূপে ধরা দেওয়া এ শিল্পীর চোখে ধরা দিয়েছে হাওরবাসীর জীবন-যাপন ও টিকে থাকার লড়াই। তার কথায়, ‘একটু লম্বা সময় থাকায় হাওড়ের বাসিন্দাদের সম্পর্কে কিছু ধারণা হয়েছে। অনেক পরিবার আছে পড়াশোনা করেছে, চাকরি-ব্যবসা করছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে থাকছে। আবার অনেক গৃহস্থ পরিবার আছে। জমি চষে জীবকা নির্বাহ করে। পরিবারগুলোর বিঘার পর বিঘা জমি। তবে সেগুলো ছয় মাস থাকে পানির নিচে। জলের বুকে তখন বড় বড় ট্রলার-নৌকা চলে। ওই সময় কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর জন্য জীবনযাপন মুশকিল হয়ে যায়।’ 

782276471_10243756770275476_2165883638604243123_n

স্থানীয়দের কাছে রুনা শুনেছেন বিঘার পর বিঘা ফসল তলিয়ে যাওয়ার করুণ গল্প। চাষার বুকের আশার জলাঞ্জলির আখ্যান। বললেন, ‘এখানকার জমিগুলোতে এক ফসল হয়। অনেক সময় তারা সে ফসলও ঘরে তুলতে পারে না। খেতের ধান কাটার আগেই পানিতে তলিয়ে যায়। এরকম যে প্রত্যেকবার হয় তা না। তবে যেবার হয় সেবার ধাক্কা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।’ 

প্রান্তিক নারী নিরালা ‘জলপবনে’র গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর একটি। বললেন, ‘আমার চরিত্রের নাম নিরালা। হাওড়ের এক প্রান্তিক নারী। এই সিনেমায় আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আছে। এর একটি বয়াতি চরিত্র। এতে অভিনয় করেছেন সামিউল হক। আরেকটি চরিত্র ফেরিওয়ালার। অভিনয় করেছেন সুশান্ত পৃথ্বীরাজ। শিশু চরিত্র আছে। বৃন্দা নামের এক শিশুশিল্পী অভিনয় করছে। দারুণ কাজ তার। চরিত্রগুলোকে ঘিরে আবর্তিত হবে গল্প। যেখানে উঠে আসবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্রও। নির্মাতা রাজন তালুকদারের বাড়ি এখানে। তার বেড়ে ওঠাও হাওর অঞ্চলে। হাওরের সাধারণ মানুষের জীবনের গল্প বলতে চেয়েছেন তিনি। 

783985382_10243801842562255_313531422383684267_n

অভিনেত্রী মনে করছেন, জলপবনের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। কারণ হিসেবে জানালেন, ছবিটি কয়েকজন স্বপ্নবাজ তরুণের প্রচেষ্টা। যারা চলচ্চিত্রের ওপর পড়ালেখা করে নেমেছেন নির্মাণে। রাজন বিসিটিআই থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছেন। চিত্রগ্রাহক খালেক সাদমানসহ আরও কয়েকজন তরুণ আছেন যারা একই প্রতিষ্ঠান থেকে শিখেপড়ে সিনেমা বানাতে এসেছেন। 

আরআর