বিনোদন ডেস্ক
০৩ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
আজ ৩ আগস্ট, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। সাত দশক আগে ১৯৫৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ ঢাকার রূপমহল প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল। এই ছবির হাত ধরে সূচনা ঘটেছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের। যা পরবর্তীতে ‘ঢালিউড’ নামে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিতি লাভ করে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানে নিজস্ব কোনো চলচ্চিত্রশিল্প ছিল না। কলকাতার বাংলা ছবি, হিন্দি কিংবা উর্দু সিনেমা আর হলিউডের ওপর নির্ভর করতে হতো দর্শকদের। ১৯৫৩ সালে ঢাকায় আয়োজিত এক সভায় চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে আলোচনার সময় এক অবাঙালি পরিবেশক মন্তব্য করেন পূর্ব পাকিস্তানের আর্দ্র আবহাওয়ায় সিনেমা তৈরি করা অসম্ভব। তাঁর মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান আবদুল জব্বার খান।
তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে ঘোষণা করেন, এই মাটিতে বাংলা ছবি বানিয়ে দেখাবেন। সেই জেদ ও সাহসিকতা পরবর্তীতে পাল্টে দেয় এ দেশের ইতিহাসের ধারা। তবে সে সময় পর্দায় কাজ করার মতো নারী শিল্পী পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। তাই সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে অভিনেত্রী খুঁজতে হয়েছিল। পাশপাশি ছবি বানানোর মতো প্রাতিষ্ঠানিক স্টুডিও, দক্ষ কলাকুশলী ও আধুনিক যন্ত্রপাতি— কোনো কিছু ছিল না তখন। একটি পুরোনো ক্যামেরা এবং সাধারণ ফিলিপস টেপ রেকর্ডার দিয়ে শুরু হয় এর কাজ। সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে জব্বার খানের লেখা জনপ্রিয় মঞ্চনাটক ‘ডাকাত’ অবলম্বনে। ছবির পোস্টার আজও সিনেমাপ্রেমীদের নজর কাড়ে। ছবির পোস্টার ডিজাইন করেছিলেন সুভাষ দত্ত। ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে পরবর্তীতে তিনি কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন।
বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী জিনজিরা, তেজগাঁও, সিদ্ধেশ্বরীসহ বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে শুটিং। এরপর ছবির নেগেটিভ প্রিন্টিং ও সম্পাদনার কাজের জন্য যেতে হয় লাহোরের শাহনূর স্টুডিওতে।
১৯৫৪ সালের আগস্টে হোটেল শাহবাগে জাঁকজমকপূর্ণভাবে ছবিটির মহরত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে রূপমহল হলে প্রদর্শিত হয় ‘মুখ ও মুখোশ’।
ছবির সংগীত পরিচালনা করেছিলেন সমর দাস, আর কণ্ঠ দিয়েছিলেন আবদুল আলীম ও মাহবুবা হাসনাত। পরিচালক আবদুল জব্বার খানের পাশাপাশি এতে অভিনয় করেন ইনাম আহমেদ, পূর্ণিমা সেনগুপ্তা, জহরত আরা, পিয়ারী বেগমসহ অনেকে। ইতিহাসের অংশ হওয়ার টানে অধিকাংশ শিল্পী কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করেছিলেন। প্রায় ৮২ হাজার টাকা বাজেটের এই ছবিটির জন্য অর্থায়ন করেছিলেন কালিম উদ্দীন দুদু মিয়া ও আবদুল জব্বার খানের বন্ধুরা।
সাত দশকের দীর্ঘ পরিক্রমায় ঢালিউড দেখেছে সোনালী দিন এবং দুর্দিনের নানা অধ্যায়। একসময়ের ১৭০০ সিনেমা হলের গৌরব আজ অনেকটা ম্লান। তবে আশার কথা হলো, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বর্তমানের চলচ্চিত্র নির্মাতারা নতুন সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছেন। আধুনিক ক্যামেরা, উন্নত ভিএফএক্স এবং বিশ্বমানের পোস্ট-প্রোডাকশনের হাত ধরে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ছবি দর্শককে আবারও হলমুখী করতে শুরু করেছে।
ইএইচ/