রাফিউজ্জামান রাফি
৩০ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম
শুদ্ধ সংগীতের সুবাস ছড়ান শুভাশিস মজুমদার বাপ্পা। তার আঙুলের ছোঁয়ায় ভাঁজ খোলে বাদ্যযন্ত্র। তার কণ্ঠ আনন্দ দেখায় সুরকে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তাতে সম্মোহিত বাংলা ভাষাভাষীরা। জনপ্রিয় এ সংগীতশিল্পী, সুরকার ও সংগীত পরিচালকের সঙ্গে আড্ডা জমেছিল ঢাকা মেইলের।
নির্দিষ্ট কোনো গল্প নেই। তবে পিতৃত্বকে উপজীব্য করে তৈরি। পিতার ত্যাগ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে সন্তানের প্রাপ্তির বিষয় নিয়ে ভাবনার জায়গা থেকে ‘বুড়ো নাবিকের গল্প’।

সম্প্রতি আমি বেশ কয়েকটি গান লিখলাম। ‘সময়’ নিয়ে একটি গান লিখেছি। নাম দিয়েছি ‘গলে যাওয়া সময়’। অনেকের লেখা গান-ই তো করি। তবে নিজস্ব কিছু ভাবনা থাকে যেগুলোকে নিজের মতো করে প্রকাশের তাগিদে লিখতে হয়।
ভীষণ সম্মানিত বোধ করেছি। আবেগঘন ব্যাপার ছিল আমার জন্য। কেননা অনেকদিন ধরে কাজ করলেও এভাবে কখনও সম্মানিত হইনি। আমাকে সম্মান দিয়ে তরুণ প্রজন্ম আমার গান করছে— খুব অনুপ্রাণিত হয়েছি।

তাদের প্রত্যেকে মেধাবী শিল্পী। তাদের নতুন প্রজন্ম বলা ঠিক হবে না। তারা মিউজিকে প্রতিষ্ঠিত। সেটাও বিশাল ব্যাপার। কেননা প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা আরেকজন শিল্পীর গান গেয়ে তাকে ট্রিবিউট দিচ্ছে। তাও আবার সেই আর্টিস্টের জীবদ্দশায়!
অবশ্যই দুর্লভ। এভাবে কয়জনকে ট্রিবিউট করা হয়েছে আমি জানি না। গত ৫০ বছর ধরে এই চর্চা চললে বাংলাদেশে আজকের চিত্র অন্যরকম থাকত। শিল্পীর আক্ষেপ থাকত না। ওই জায়গা থেকে আয়োজনগুলোকে একেকটা মাইলস্টোন বলে মনে হয়। এটা চলমান থাকলে যারা কাজ করছেন বা করেছেন তারা অনেক অনুপ্রাণিত হবেন।

ওটা আনা হয়নি। তবে ইনস্ট্রুমেন্টাল কাজ করছি। অনেকগুলো জমা হয়েছে। সেসব অ্যালবাম আকারে আনতে চাচ্ছি। ইনস্ট্রুমেন্টাল শ্রোতা অনেক কম। একেবারে যে নেই তা না। যারা আছেন তাদের জন্যই করা। তারা মূল্যায়ন ও সমালোচনা করলে কাজগুলো গতি পাবে।
তেমন পরিবর্তন হয়নি। তবে প্রচুর ভালো কাজ হচ্ছে। কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো অ্যালগরিদমকে প্রাধান্য দেয়। যে ধরনের কনটেন্টে ট্রাফিক বেশি সেগুলোকে তাদের অ্যালগরিম সামনে দেয়। কাজেই যেগুলোকে ভালো কাজ বলছি সেগুলোর ট্রাফিক কম থাকায় পিছিয়ে যায়। সে কারণেই গানগুলো শ্রোতা পর্যন্ত পৌছায় না। এর বিকল্প কী হতে পারে আমার জানা নেই। তবে বিষয়টা নিয়ে সবাই ভুগছি।

ভেবেছিলাম মিউজিশিয়ান ও দর্শক-শ্রোতারা বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ দেখাবেন। কিন্তু সে পরিমাণ এঙ্গেজমেন্ট নেই। তাই মনে হয়েছে যে সময়টা ওখানে দিচ্ছি সেটা সংগীতে দিই। এঙ্গেজমেন্ট বাড়লে হয়তো কন্টিনিউ করতাম। তবে যেহেতু বন্ধ করিনি ভবিষ্যতে কাজে আসতেও পারে।
যেকোনো ভিডিও নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। এখন গানের যে অবস্থা সেটা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো। সেক্ষেত্রে এআই দিয়ে ভিডিও নির্মাণ অনেক সাশ্রয়ী। কেননা এআই ভিডিও যে স্কেলে বানাচ্ছি বাস্তবে সেভাবে শুট করতে গেলে খরচের পরিমাণ হবে অনেক। বাস্তবে সম্ভব না। ওই জায়গা থেকে করা। তবে চেষ্টা করব এআই নির্ভর কাজ কমিয়ে ফেলতে। অর্গানিক ভিডিওকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে টুল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন সাপোর্ট সিস্টেমের জন্য আমরা বিভিন্ন প্লাগইন ব্যবহার করি। সেগুলোর হার্ডওয়ারের একেকটার দাম কয়েক হাজার ডলার। কিনতে গেলে অকল্পনীয় খরচ করতে হবে। সেকারণে টুল হিসেবে প্লগাইন ব্যবহার করছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেভাবে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু গোটা গান এআই দিয়ে বানানো অনুচিত। তাছাড়া এই গানের সত্তাধিকারীও এআই। আমার মনে হয় যারা এআই নিয়ে কাজ করছেন তাদের এখন এটা নিয়ে ভাবার গুরুত্বপূর্ণ সময়।
আমি মনে করি রিয়্যালিটি শো না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ টেলিভিশনগুলোর চাহিদা কমে যাওয়া। এখন যেকোনো মিডিয়ার নিজস্ব চ্যানেল আছে। ফলে টেলিভিশন মিডিয়া সাংঘাতিকভাবে ধ্বসে গেছে। এ ধরনের একটি রিয়েলিটি শো করতে যে পরিমাণ অর্থ, প্রযুক্তিগত সহায়তা দরকার সেটা এই মুহূর্তে টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য খুব মুশকিল।

যতদূর জানি বাংলাদেশে যে কয়টি রিয়্যালিটি শো হয়েছে সেগুলোর কোনোটাই পূর্ব পরিকল্পিত বা সাজানো ছিল না। এখন পর্যন্ত যতগুলো দেখেছি সবগুলোই নৈতিকতার জায়গা থেকে ঠিক ছিল।
একজন আর্টিস্টের বায়োপিক করতে মানসিকতা দরকার। যিনি বানাবেন বা বানাতে চাচ্ছেন মিউজিক কিংবা মিউজিক্যাল আর্টিস্ট সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি কী— পরিষ্কার হলে এর উত্তর পাওয়া যাবে।

বর্তমানের ফিউশন নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। তবে আমি মনে করি ফিউশন মূলত দুটি জনরাকে এক করার প্ল্যাটফর্ম। যিনি করছেন তিনি কি জনরা দুটি সম্পর্কে জানে? ধরা যাক, লোকগান ও উচ্চাঙ্গসংগীতকে ফিউশন করব। সেক্ষেত্রে আমাকে লোকগান ও ক্লাসিক্যাল মিউজিক জানতে হবে। যখন এই দুটি সম্পর্কে জানব বা ধারণা থাকবে তখন ফিউশনটা ঠিকঠাক হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফিউশন সফল না হওয়ার কারণ জ্ঞানের ঘাটতি।
সৌভাগ্যবশত এটা আমার জন্য দায়বদ্ধতা হিসেবে কাজ করেনি। কেননা ক্যারিয়ারের শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সংগীতে বাবার পরিচয় ব্যবহার করব না। এখন পর্যন্ত যতটুকু করেছি নিজের পরিচয়ে। দ্বিতীয়ত বাবা-মা ছিলেন খাঁটি ধ্রপদী সংগীতের। আমি ঠিক সে ঘরানার না। তাই চাপটা কম। পাশাপাশি পরিবার থেকে কখনও সংগীত নিয়ে কোনো চাপ ছিল না। বাবা মা দুজনেই বলতেন, যাই করো ভালোভাবে করো।

আমার কোনো প্রত্যাশা নাই। কারণ আমি কোনো কিছু আশা করে কাজ করি না। একটা জিনিস অবশ্য মাঝেমধ্যে পীড়া দেয়। যে উত্তেজনা নিয়ে কাজ করি পরে মনে হয় যেভাবে ভেবেছিলাম সেভাবে হচ্ছে না। তখন এক ধরনের বেদনা হয়। তবে ৩৫ বছরের ক্যারিয়ারে যে পরিমাণ ভালোবাসা, সম্মান, সমর্থন পেয়েছি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হয়।
সঞ্জীব দাকে নিয়ে বললে শেষ হবে না। আমার সংগীত ক্যারিয়ারে কয়েকজন মানুষ আছেন যাদের অবদান বিশাল। প্রথম জন আবিদুর রেজা জুয়েল ভাই। দ্বিতীয়জন সঞ্জীব চৌধুরী। সঞ্জীব দা আমার কাছে বিশাল বৃক্ষের মতো। সেই বৃক্ষের নিচে ছায়া, আশ্রয় ও প্রশান্তি পাওয়া যায়। অনেক কিছু জানা ও শেখা যায়। অসাধারণ একজন মেন্টর, বড় ভাই, বন্ধু, শিক্ষক। সঞ্জীব দা সম্পর্কে যত বলব ততই কম বলা হবে।
_20260730_184126377.jpg)
বিষয়টা হতাশাজনক। পেশাটা প্রচণ্ডরকম অনিশ্চয়তার। আমার শো থাকলে চলতে পারব। না থাকলে চলতে পারব না। আর আমাদের জনগোষ্ঠী অনুযায়ী গানের মানুষের সংখ্যা খুব কম। তাদের নিয়ে কেউ ভাবে না। এটা যদি বৃহৎ জনগোষ্ঠী হতো তবে হয়তো রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের নিয়ে ভাবা হতো। কিন্তু কমিউনিটিটা এত ছোট যে তাদের নিয়ে ভাবার কেউ নেই। দ্বিতীয়ত আমাদের দেশে ক্রিয়েটিভ মানুষদের মূল্যায়ন করার বিষয়টি কখনও ছিল না। সে গায়ক, সুরকার, লেখক, গীতিকবি, চিত্রশিল্পী, নাট্য ব্যক্তিত্ব— যাই হোক তাদের নিয়ে ভাবার কেউ নেই। তারা যে একটি রাষ্ট্রের অন্যতম খুঁটি সে দৃষ্টিকোণ থেকেও কেউ কখনও ভাবেনি। অতএব জনগোষ্ঠী যদি এটাকে মানসিকভাবে সমর্থন না করে তবে টিকে থাকা কঠিন।
আরআর