রাফিউজ্জামান রাফি
২০ জুন ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম
ক্যারিয়ারের শুরুতেই সাড়া জাগিয়েছিলেন সাদিয়া জাহান প্রভা। বেশ কিছু মানসম্মত কাজের মাধ্যমে ছন্দে পথ চলছিলেন। ব্যক্তিজীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায় হঠাৎ ছন্দপতন। প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে কাজে ফিরলেও প্রভার পিছু নেয় সাইবার বুলিং। ১৬ বছর ধরে সামাজিক মাধ্যমে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন তিনি।
সম্প্রতি নিজের ফেসবুকে প্রকাশিত এক ভিডিওতে প্রভা বুলিংকারীদের মনস্তত্ত্ব এবং সমাজে ভিকটিম ব্লেমিংয়ের সংস্কৃতি নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে বুলিং করা হচ্ছে অলমোস্ট ১৬ বছর ধরে। আপনারা আমাকে বুলিং করে মজা পান, এটা আপনাদের একটা পৈশাচিক আনন্দ হয়, তা আমি টোটালি আন্ডারস্ট্যান্ড করি। কিন্তু ঠিক যতটুকু আমাকে বুলিং করছেন, তার যদি ৫০ শতাংশ আমাকে (ভিকটিমকে) করে বাকি ৫০ শতাংশ ক্রিমিনালটাকে খুঁজে বের করে মক করতেন, ওকে নিয়ে লেখালেখি করতেন, ওর চেহারাটা বারবার মানুষের সামনে আনতেন যে ও একজন ক্রিমিনাল, তাহলে পরিস্থিতি এমন হতো না।’
প্রভার সঙ্গে চলমান আচরণের কি কোনোই প্রতিকার নেই— উত্তর খোঁজার পাশাপাশি সাইবার বুলিংয়ের ক্ষতিকর প্রভাব ও আইনি প্রতিকার প্রসঙ্গে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা হয় বিশেষজ্ঞ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, ‘আমরা বুলিংকে নরমালাইজ করেছি। এটা সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়। শুধু প্রভার ক্ষেত্রে না, কারও সঙ্গে মতানৈক্য হলেই সামাজিক মাধ্যমে বানোয়াট মিথ্যা ছড়ানো হয়। ভিকটিম শুরুতে প্রতিবাদ করলেও পরে কথা বলতে চান না। কেননা একজন মানুষের পক্ষে বারবার একই বক্তব্য দেওয়া সম্ভব না। এর প্রধান কারণ বুলিং নিয়ে আমাদের আইনগত পদক্ষেপ, হস্তক্ষেপ— কোনোটাই নেই। তথ্য মন্ত্রণালয় চাইলেই বিটিআরসি দিয়ে এই বিষয়গুলো থামাতে পারে। কিন্তু বিটিআরসির নীরবতা অথবা ডিজিটাল ইললিটারেসি এই ঘটনাগুলোর অন্যতম কারণ।’
তার কথায়, ‘কোনো শিল্পী বা সাধারণ কারও ব্যক্তিগত বিষয় ডিজিটাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া রোধ করা তথ্য মন্ত্রণালয়ের তাৎক্ষণিক দায়িত্ব। তারা চাইলেই প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিতে পারে। ফেসবুক যেমন অশালীন কিছু ব্যবহার করলে সেগুলো সার্কুলেট করে না। অথচ আমাদের এখানে অনায়াসে মানুষকে গালাগাল করা যায়। টাকা দিয়ে নাকি গালি কেনাও যায়। এখানে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টকে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত করে তোলা হয়েছে। জনগণের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য ব্যবহারের কথা থাকলেও তা ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে।’
সাইবার বুলিং বিস্তারের দায় মিডিয়ার ওপরও বর্তায় বলে মনে করেন এই অধ্যাপক। বলেন, ‘আরও একটি কারণ হচ্ছে মিডিয়ার ক্লিকবেটকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়া। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে যেগুলো মুখরোচক হবে সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা। আজ প্রভা কাল আপনার পরিবারের কেউ কিংবা আপনিও আক্রান্ত হতে পারেন। অথচ এই সচেতনতা মিডিয়ার নেই। এক্ষেত্রে মিডিয়ার অ্যাসোসিয়েশনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোন সংবাদ প্রচার করা যাবে, কোনটা যাবে না; উপরন্ত সেগুলো যেন প্রচার না হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করার মতো কঠোর সিদ্ধান্তে তাদের আসা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৪(১) ধারা অনুযায়ী, অপরাধের শিকার নারী বা শিশুর পরিচয় (নাম, ছবি, ঠিকানা ইত্যাদি) গণমাধ্যমে প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু আমাদের এখানে উল্টো চর্চা। ভিকটিমকে সামনে আনা হয়। রাজীবকে কেউ চেনে না অথচ প্রভাকে সবাই চিনি। ধরলাম প্রভা শিল্পী বলে তার পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু রামিসা, আসিয়ারা সাধারণ মানুষ। তাদের নাম-চেহারাও আমাদের মুখস্থ হয়ে গেছে। অথচ হিটু শেখ, সোহেল রানাদের কেউ চেনে না। প্রভাকে প্রশ্ন করা হয়েছে— আপনার কেমন লাগছে। অথচ রাজিবকে প্রশ্ন করা উচিত ছিল— তিনি এগুলো কেন করলেন। আইনের বিচার প্রক্রিয়া প্রমাণ ও সময় সাপেক্ষ। কিন্তু গণমানুষের সচেতনতা, বিদ্বেষ বা ঘৃণার উৎপাদন প্রক্রিয়া রাজনৈতিক। এখানে সচেতনভাবে ক্রিমিনালকে ছাড় দেওয়া হয়। রাজিবের ব্যক্তিজীবন, মানসিকতা যদি সামনে আনা হতো তার জন্য এক ধরনের বিচার হতো। আমরাও সচেতন হওয়ার সুযোগ পেতাম।’
গণসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে মানুষকে সচেতন করা উচিত বলে মনে করছেন তিনি। বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নিয়ে গণসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন জরুরি। যেমন ডিজিটাল মাধ্যমে ক্ষতিকর কোনো কনটেন্ট দেখলে রিপোর্ট করতে হবে। শেয়ার করা বা অন্যকে পাঠানো থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা এটি করলে অ্যালগরিদম ওই কনটেন্টগুলো বেশি মানুষের সামনে নিয়ে যায়। এই সচেতনতা তৈরি জরুরি।’
বুলিংয়ের ভয়াবহতা ও আইনি ব্যবস্থা নিয়ে স্নিগ্ধা রেজওয়ানা বলেন, ‘প্রভার কেস নিয়েই বলি। একজন মানুষের সামাজিক, মানবিক মর্যাদা ধূলিসাৎ করে দেয়। আত্মহননে প্ররোচিত করে। কিন্তু আত্মহত্যার প্ররোচনাকারীর শাস্তির বিধান থাকলেও এরকম প্ররোচনার মাধ্যমে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেই। এর ভয়াবহতা নিয়েও কাজ করা হচ্ছে না।’

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাক্তার তাজুল ইসলাম বলেন, ‘যাকে বুলিং করা হয় তিনি লজ্জিত, ব্যথিত, উদ্বিগ্ন ও অস্থির থাকেন। কেননা বিষয়টি সম্মানের সঙ্গে জড়িত। তার পরিবার, পরিজনও অপদস্ত হয়। ফলে তিনি একা হয়ে পড়েন। তার মধ্যে বিষণ্ণতা দেখা দেয়। ক্যারিয়ার নষ্ট হয়। লাগাতার চলতে থাকলে ভিকটিম মেজর ডিপ্রেশনে ভুগতে পারে, আত্মহত্যাও করতে পারে। নিজের ও অন্যের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে পারে। এরকম বিভিন্ন মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।’
বুলিংকারীদের নিয়ে এ অধ্যাপক বলেন, ‘মানুষ মূলত অ্যানিমেল। আমাদের দুটি সত্তা। পাশবিক ও মানবিক। মানবিক সত্তা শক্তিশালী হলে পশুত্ব মাথাচাড়া দিতে পারে না। কিন্তু যারা বুলিং করে তাদের পাশবিক সত্তা প্রাধান্য পাচ্ছে। মানুষের মতো দেখা গেলেও তাদের আচরণ অমানুষের। অন্যকে ক্ষেপিয়ে, লজ্জায় ফেলে, বিপদে ফেলে, অপদস্ত করে বিকৃত আনন্দ পায়। অনেকটা মাদকের মতো। মাদকাসক্তরা একসঙ্গে হলে কে কোন মাদক নিয়ে কেমন বোধ করেছে, কে কতটুকু সেবন করতে পারে— এসব নিয়ে আলাপ করে। বুলিংকারীরাও তেমন। কার বুলিং কতটা কার্যকর হলো, কে কত সফল হলো, কার বুলিংয়ে ভিকটিম কেঁদে ফেলল— সেগুলোকে অর্জন হিসেবে দেখে।’
অভিভাবকদের দায় দিয়ে এ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সন্তানরা কী করছে, অন্যের সঙ্গে সুস্থ আচরণ করছে নাকি অসামাজিক ব্যবহার করছে— অভিভাবকদের উচিত খোঁজ নেওয়া। অন্যথায় এমন আইন করা উচিত যেখানে অপরাধীদের পাশাপাশি অভিভাবককেও বিচারের আওতায় আনা যায়।’

বুলিংকে মানসিক রোগ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তরুণদের মাধ্যে এ সমস্যা দেখা গেলে তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে কনডাক্ট ডিজঅর্ডার বলে। তবে পরিণত কিংবা বয়সী মানুষের মধ্যেও এরকম আচরণ লক্ষ্য করা যায়। তাকে বলে সাইকোপ্যাথ। এটি এক ধরনের বিকৃত মানসিকতা। তাদের ব্যক্তিত্বে ত্রুটি রয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ‘নেটিজেনদের বড় একটি অংশের সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার বিধি ও নীতি নৈতিকতার বিষয়ে শিক্ষা ও সচেতনতা দরকার আছে। ডিজিটাল লিটারেসির প্রয়োজন আছে। সবাই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করলেও এর সঠিক ব্যবহার অনেকেই জানেন না। রিয়েল লাইফের মতো সোশ্যাল লাইফের আচরণবিধিও শেখা দরকার।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন বাইস্ট্যান্ডার্ড হওয়ার সময় এসেছে। অর্থাৎ আমি অপরাধী নই কিন্তু অপরাধটা অনলাইনে দেখছি। আমাকে রিপোর্ট করতে হবে। আমরা অনেকেই বিষয়টি এড়িয়ে যাই। তা না করে যদি রিপোর্ট করি তবে সেটা বেশ কার্যকর। আমি যেখানেই যাই এই বিষয়টির ওপর জোর দিই। কেননা সোশ্যাল মিডিয়ার যে পরিমাণ ব্যবহার হচ্ছে তাতে সবকিছু যেমন আইনের মধ্যে ফেলা মুশকিল তেমনই অনেক সময় ভুক্তভোগীও আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে চান না। সেক্ষেত্রে ডিজিটাল লিটারেসি বৃদ্ধির পাশাপাশি বাই স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে রিপোর্ট করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।’
সাইবার বুলিং রোধের আইন সম্পর্কে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজমেরি সুমি বলেন, ‘বুলিং (Bullying) বলতে কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার কষ্ট দেওয়া, অপমান করা, ভয় দেখানো বা হয়রানি করাকে বোঝায়। অনলাইনে (ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটক ইত্যাদিতে) অপমান বা হয়রানি করাকে বলা হয় সাইবার বুলিং। সহজ ভাষায়, কাউকে দুর্বল মনে করে বারবার কষ্ট দেওয়াই বুলিং।’
তার কথায়, ‘বুলিংয়ের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। বুলিং শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সব আইনের সাথে। যেমন সাইবার বুলিং দণ্ডবিধি পেনাল কোড ১৮৬০। কিন্তু সাইবার বুলিং নামে আলাদা কোনো ধারা নেই। তবে সাইবার বুলিংয়ের ধরণ অনুযায়ী বিভিন্ন ধারা প্রয়োগ করা হতে পারে।’
উদাহরণ দিয়ে আজমেরি সুমি বলেন, ‘অনলাইনে কাউকে ভয় দেখালে বা হুমকি দিলে পেনাল কোড অনুযায়ী ক্রিমিনাল সংক্রান্ত ধারা প্রযোজ্য হতে পারে। এছাড়াও মানহানি, ভুয়া তথ্য ছাড়ানো, যৌন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের ক্ষেত্রে সাইবার সম্পর্কিত বিশেষ আইন প্রয়োজন হতে পারে। তবে সাইবার অপরাধ মোকাবেলার জন্য আগে ছিল ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৮। বর্তমানে সাইবার সংক্রান্ত অপরাধগুলো প্রতিরোধ করতে রয়েছে সাইবার সিকিউরিটি আইন ২০২৩। কিন্তু অনলাইনে বুলিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই।’
আরআর