রাফিউজ্জামান রাফি
০৪ জুন ২০২৬, ০২:০১ পিএম
কোরবানি ঈদে একগুচ্ছ সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। ছবিগুলো হলো— ‘রকস্টার, ‘মালিক’, ‘রইদ’, ‘বনলতা সেন’, ‘পিনিক’, ‘মাসুদ রানা’, ‘আফিসার’, ‘তছনছ’, ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’।
‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’-এর কপালে হল জোটেনি। বাকি ছবিগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে মাল্টিপ্লেক্সের পাশাপাশি নিয়মিত ও মৌসুমী মিলিয়ে দেড় শর মতো সিঙ্গেল স্ক্রিনে। খোঁজ নিয়ে জানা গেলে শাকিব-শুভ-বুবলী- তুষি সবাই এলেও দর্শক আসছেন না তেমন। ফলে মাল্টিপ্লেক্সে হতাশা, সিঙ্গেল স্ক্রিনে হাহাকার।
_20260604_141539743.jpg)
মাল্টিপলেক্স
ঈদের ছবিগুলো আশানুরূপ ব্যবসা করছে না মাল্টিপ্লেক্সে। হতাশা ঝরে পড়ল দেশের বৃহত্তম মাল্টিপ্লেক্স চেইন স্টার সিনেপ্লেক্সের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদের কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘এবারের ঈদে স্টার সিনেপ্লেক্সে দর্শকদের সাড়া আশা করেছিলাম, বাস্তব চিত্রটি ঠিক তেমন হয়নি। আশানুরূপ ব্যবসা হচ্ছে না। কোনো ছবিই প্রত্যাশানুযায়ি দর্শক টানতে পারছে না।’
আশার বাতি জ্বালিয়ে রেখেছেন এ কর্মকর্তা। বললেন, ‘তবে আশা করছি দর্শক বাড়বে। অনেক সিনেমার ক্ষেত্রে দেখেছি ধীরে ধীরে দর্শক বাড়ে। দেখা যাক কী হয়!’
যমুনা ব্লকবাস্টারের মার্কেটিং বিভাগের সহকারী ম্যানেজার মাহবুবুর রহমানও আশা জাগানিয়া কিছু শোনালেন না। বললেন, ‘‘গড়পড়তা যাচ্ছে সিনেমাগুলো। ‘রকস্টার’ নিয়ে প্রত্যাশা অনেক ছিল। ভেবেছিলাম ৮-১০টা শো দেব। হাউজফুল যাবে। সেরকম হচ্ছে না। প্রথম দিকে বিকেলের শোগুলো হাউজফুল ছিল। এখন অ্যাভারেজ যাচ্ছে সিনেমাটি। বাকি সিনেমাগুলো আরও স্লো যাচ্ছে। কোনোটাই হাউজফুল না। আশানুরূপ ব্যবসা হচ্ছে না।’’

ঢাকার অদূরে কেরানিগঞ্জে অবস্থিত লায়ন সিনেমাসের কর্ণধার মির্জা আব্দুল খালেক বলেন, ‘‘যেটুকু চলার ‘রকস্টার’’ চলছে। তবে প্রত্যাশানুযায়ী না। হাউজফুল যাচ্ছে না। সকালের শোগুলো খারাপ থাকে। সন্ধ্যার দিকে ৫০-৬০ শতাংশ দর্শক হয়। ‘মালিক’ মোটামুটি যাচ্ছে। বাকিগুলো বলার মতো না। ঈদেই ব্যবসাটা করি। কিন্তু রোজার ঈদেও ব্যবসা হয়নি। এ ঈদেও পেলাম না।’’
খোঁজ নেওয়া হলো কুমিল্লার কে স্ক্রিনে। কর্ণধার খোরশেদ আলম খসরুও হতাশ। বললেন, ‘দর্শক অনেক কম। আশানুরূপ ব্যবসা হচ্ছে না। গেল ঈদগুলোতে দেখেছি সিনেমা ভালো না লাগলেও প্রথম সপ্তাহে দর্শক থাকে। ছুটি কাটাতে হলেও তারা আসেন। এবার সেরকমও হচ্ছে না।’
কোনো সিনেমা-ই প্রত্যাশানুযায়ী দর্শক আনতে সক্ষম হচ্ছে না উল্লেখ করে খসরু বলেন, ‘‘রকস্টারে কিছু দর্শক আছে। অন্যগুলোতে আরও কম।’’
সিঙ্গেল স্ক্রিন
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মধুমিতা সিনেমা হল শাকিব খানের ঘাটি হিসেবে বিবেচিত। এবার সে ঘাটেও নেই শাকিবিয়ানদের আনা গোনা। ‘রকস্টার’ চালিয়ে হতাশ হলের কর্ণধার ইফতেখার নওশাদ। বললেন, ‘একটি শো-ও হাউজফুল যায়নি। প্রথম শো থেকেই দর্শকের উপস্থিতি কম। এখন আরও কমে গেছে। স্টাফদের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, শাকিবের দর্শকরা অ্যাকশনধর্মী সিনেমা চায়। এ ছবিতে মারামারি নেই। অর্থাৎ তারা যেরকম শাকিবকে চায় সেরকম পাচ্ছে না।’
রাজধানীর শ্যমলীতে চলছে ‘রকস্টার’। তবে ছবির পারফর্মেন্সে অসন্তুষ্ট হল কর্তৃপক্ষ। ফুটে উঠল হলের হাউজম্যান আহসান উল্লাহর কথায়। তিনি বলেন, ‘খুব খারাপ অবস্থা। কোনো শো হাউসফুল যায়নি। দর্শকই পাচ্ছি না। যারা দেখছেন তাদের অধিকাংশ অসন্তুষ্ট। শাকিবের নতুন অবতার নিতে পারছেন না তারা।’
‘রকস্টার’ থেকে প্রত্যাশানুযায়ী ব্যবসা হচ্ছে না সিলেটের গ্র্যান্ড রিভারভিউ সিনেমা হলেও। এক্সিকিউটিভ মিনহাজ বলেন, ‘শুরুর দিন হাউজ ফুল ছিল শোগুলো। এরপর থেকে সেল পড়ে যায়। এখন শো প্রতি ২০-২২ জন করে দর্শক হচ্ছে।’

টেকের হাটের সোনালী হল ভাড়া নিয়ে সিনেমা চালান রাহুল খান। বড় আশা করে ‘রকস্টার নিয়েছিলেন। কিন্তু দুটো পয়সা লাভের ঝুলি জমছে না। বললেন, ‘প্রথম দুই শোয়ে এমনিতেই লোক কম হয়। সন্ধ্যায় ভালো হয়। কিন্তু এই ছবির বেলায় সেরকম হলো না। হাউসফুল দূরের কথা কোনো শোয়ে এক শ লোকও হয়নি। আজকাল দিনে কোনো শোয়ে পাঁচজন, কোনোটায় ১০ জন হয়। সন্ধ্যায় ১০-১৫ জন আসে। এই অবস্থায় লাভ হওয়ার প্রশ্নই আসে না। খরচের টাকা আসবে কি না সন্দেহ।’
ঢাকার অদূরের উপজেলা শহর নাগরপুরের রাজিয়া সিনেমা হলে দায়িত্বে থাকা মো. আমিন বলেন, ‘‘প্রিন্সে‘র চেয়েও খারাপ যাচ্ছে। হাউসফুল দূরের কথা কোনো শোয়ে ১০০ টিকিটও বিক্রি করতে পারিনি। আজকাল তো ৫-৬ জন করে দর্শক হচ্ছে। ১৫-২০ জন করে হলেও মনকে বুঝ দিতে পারতাম। গেল ঈদে ধার-কার্য করে হল মেরামত করেছিলাম। ভেবেছিলাম সিনেমা চালিয়ে টাকা শোধ করব। কিন্তু প্রিন্স চালিয়ে খেয়েছি ধরা। আশা ছিল এই ঈদের ছবি দিয়ে ঋণমুক্ত হব। সেটিও সম্ভব না। হল বোধহয় আর চালাতে পারব না।’’
চট্টগ্রামের সুগন্ধা সিনেমা হলে চলছে ‘রকস্টার’। ছবিটি কেমন চলছে জানতে চাইলে হলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফ হোসাইন বলেন, ‘অবস্থা খুব খারাপ। একটি শো-ও হাউসফুল যায়নি। এরমধ্যে সেল পড়ে গেছে। দশ শতাংশ দর্শকও হচ্ছে না। পুরোটাই লোকসান।’

সাইফের কথায়, ‘আমি মনে করি সিনেমা বানানোর আগে বাজার গবেষণা করে নেওয়া উচিত। কেননা একটি ছবির সঙ্গে অনেকে জড়িত থাকে। ফ্লপ গেলে তারা লোকসানে পড়ে। যেমন আমরা হল মালিকরা এবার লোকসানে পড়েছি।’
রাজবাড়ির সাধনা সিনেমা হলে চলছে আরিফিন শুভ অভিনীত ‘মালিক’ সিনেমা। কেমন চলছে জানতে চাইলে হল মালিক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘ঈদের দিন বিক্রি হয়েছিল ১২ হাজার টাকার টিকিট। পরের দিন ৩ হাজার টাকার। তারপর দিন ২৭০০। এরপরের দিন এক শ চলেছে। তিন হাজার টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছে। তার পরের দিন ১৩০০ টাকা। দুপর ও নাইট শো বন্ধ গেছে দর্শকের অভাবে।’
কেন দর্শক হচ্ছে না— জানতে চাইলে বলেন, ‘ধুর, এসব ছবি হয়! এগুলো মানুষ দেখে নাকি! বাজে ছবি।’
তবে ‘রকস্টার’ না নিয়ে লোকসানের পরিমাণ কমেছে বলে মনে করছেন তিনি। বললেন, ‘শাকিব খানের ছবি আড়াই লাখ টাকা দিয়ে নিয়ে মরতাম নাকি! ফরিদপুরের বনলতা সিনেমা হলের মালিক আলিম নিয়েছে। প্রথম শোয়ে দর্শক হয়েছে ৩৮ জন। সে বলেছে, শাকিবের ছবি আর চালাব না। কালুখালীতে ঈদের দিন ৬০ হাজার, তার পরের দিন ২০ হাজার টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছে। তার পরের দিন আর সেল নাই। সারা দেশে এই অবস্থা। আমি আর হল চালাতে পারব না বলে মনে হচ্ছে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাজমহল সিনেমা হলেও কোমর সোজা করতে পারেনি শুভর ‘মালিক’। ম্যানেজার আব্দুল হক বলেন, ‘একটা শো-ও হাউজফুল যায়নি। শুরুতে ২০-৩০ জন করে দর্শক হতো। এখন ৫-৬ জন হয়। দর্শকের অভাবে শো-বন্ধও থাকে। এর আগে প্রিন্স চালিয়ে লোকসানে পড়েছি। এবারও লাভ করতে পারলাম না।’

‘মালিক’ চালিয়ে ভরাডুবি হয়েছে বলে জানালেন বগুড়ার সোনিয়া সিনেমা হলের কাউন্টার মাস্টার মো. আমিনুল। তার কথায়, ‘প্রথম দিন থেকেই খারাপ অবস্থা। কোনো শো-ই হাউজফুল যায়নি। কখনও ৬-৭ জন কখনও ২-৪ জন করে দর্শক হচ্ছে। ছবি ভালো কিন্তু দর্শক নেই। তারা যে কেন আসছেন না বুঝতে পারছি না।’
জামালপুরের আশা সিনেমা হলের অপারেটর সোলায়মান জনি জানালেন ‘মালিক’ দেখতে দর্শক আসছেন না। বলেন, ‘লোকজন নেই বললেই চলে। বন্ধই থাকে বেশি শো। ২-৪ জন দর্শক হয়। মুক্তির দিন থেকেই এরকম। কোনো শো-ই হাউজফুল যায়নি। পুরাই লস।’
যা বলছে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি
ঈদের সিনেমাগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট নন চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল। তার কথায়, ‘ব্যবসা হচ্ছে না। ছবিগুলো নির্মাণের ক্ষেত্রে আরও যত্নবান হওয়া উচিত ছিল।’
ঈদে বাকিরা হতাশ করলেও শাকিবের সিনেমার ভুমিকা থাকে সংসারের বড় ছেলের মতো। হাসি ফোটায় হল মালিকদের মুখে। গেল রোজার ঈদে ছিল ব্যতিক্রম। এবারও তাই। কারণ হিসেবে উজ্জ্বল বলেন, ‘ছবিতে নতুনত্ব আছে। কিন্তু দেশের দর্শক কি চাচ্ছেন সেটাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সমন্বয় না হওয়াতেই এই অবস্থা বলে মনে হচ্ছে।’
আরআর