বিনোদন ডেস্ক
২২ মে ২০২৬, ১০:৫৯ এএম
১৯৯৪ সালের এক ভয়াল ডিসেম্বর। পঞ্চম শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে যখন এক চিলতে আনন্দের খোঁজে ছোট চাচার হাত ধরে ঢাকায় বেড়াতে গিয়েছিল সাড়ে ৯ বছরের এক শিশু, ঠিক সেই রাতেই তার নারায়ণগঞ্জের বাড়িতে হানা দেয় সশস্ত্র ডাকাত দল। চারজন ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী সশস্ত্র যুবক ঘরে ঢুকেই হাত-পা বেঁধে ফেলে মা, ভাই আর নানীকে। কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য যেন টাকা-পয়সা লুটপাট ছিল না, তাদের চোখ খুঁজছিল সেই ছোট্ট মেয়েটিকে। চিৎকার করে তারা বারবার প্রশ্ন করছিল, লোপা কই?
পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও যখন লোপাকে পাওয়া যায়নি, তখন ভাইয়ের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে চলে অবর্ণনীয় মানসিক নির্যাতন। ঘরে থাকা নগদ টাকা, গহনা, এমনকি ভাই-বোনের পুরস্কার পাওয়া মেডেলগুলো পর্যন্ত লুটে নিয়ে যায় তারা। ভাগ্যক্রমে সেদিন ছোট চাচার বাসায় থাকায় প্রাণে বেঁচে গেলেও, সেই রাতের ঘটনা আজীবনের জন্য এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে ক্লোজআপ ওয়ান খ্যাত জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী লোপা হোসেইনের মনে।

দীর্ঘ তিন দশক পর সামাজিক মাধ্যমে নিজের জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন শিল্পী। শৈশবের সেই দুঃসহ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লোপা লেখেন, ‘আমার সারাটা জীবন কেটেছে ধর্ষিত হবার ভয়ে...জি, ঠিক পড়ছেন। ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতায় সাহসী মেয়ে টাইটেল পাওয়া এই লোপা বড় হয়েছে এক ভয়ানক ট্রমা নিয়ে।’
তিনি যোগ করেন, ‘বহুবার ভেবেছি যে সেদিন যদি ছোট চাচা ফেরেশতার মতো এসে আমাকে নিয়ে চলে না যেতেন, আমি যদি বাসায় থাকতাম, তাহলে কি হোতো। আমার বয়স তখন সাড়ে ৯ বছর। সেইদিন থেকে আজ অব্দি আমি এই ট্রমা বয়ে বেড়াচ্ছি। সেই সময় থেকেই আমার দুঃস্বপ্ন দেখার সমস্যার শুরু যা এখনো আছে, তবে কিছুটা কমেছে। বহুবার স্বপ্নে আমি নিজেকে মানুষ, ভূত আর এলিয়েনের হাতে কিডন্যাপ হতে দেখেছি। বহুবার আমি স্বপ্নে আমার একমাত্র ভাইকে ভয়ংকরভাবে মারা যেতে দেখেছি।’
সেই ডাকাত দলের অন্যতম সদস্য রহমত পরবর্তীতে এলাকার এক কুখ্যাত অপরাধীতে পরিণত হয়েছিল। শিল্পী জানান, র্যাবের ক্রসফায়ারে যখন অপরাধী নিহত হয়, তখন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তার লাশের ওপর জুতা ও থুথু নিক্ষেপ করেছিল।

সমাজের বুকে ঘটে যাওয়া প্রতিনিয়ত শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনাগুলো লোপাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় ১৯৯৪ সালের অন্ধকার রাতে। লোপা বলেন, ‘যখনই কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে কোন শিশুর সাথে এই ভয়ানক নৃশংসতা ঘটে, আমি এখনো ভয়ে কুঁকড়ে যাই। কি বলবো, কি লিখবো, ভাষা খুঁজে পাইনা। আমি তখন নিজের অজান্তেই ১৯৯৪ সালে ফিরে যাই। আমার এই অনুভূতি, আমার এই ভয়, এই ট্রমা আমি কোনদিন কারও সাথে শেয়ার করতে পারিনি। সারাজীবন 'সাহসী মেয়ে'র অভিনয় করে গেছি। অথচ আমার সারা জীবন কেটেছে পুরুষদের ভয় পেয়ে।’
লোপা হোসেইন আরও জানান, যাদের কাছে এই দুর্ঘটনাকে গল্প মনে হবে, তারা নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় গিয়ে ১৯৯৪ সালের ডাকাতির ফাইল ঘাটলেই এর প্রমাণ পেয়ে যাবেন। তৎকালীন সময়ে বেশ কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় এই ঘটনাটি ভপ্রবাসী মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।
ইএইচ/