images

বিনোদন

চার ঘণ্টা হত্যার চেষ্টা, তালেবানদের হাত থেকে বেঁচে ফেরার গল্প নূরের

বিনোদন ডেস্ক

০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০০ পিএম

ঈদে মুক্তি পাওয়া আলোচিত সিনেমা ‘দম’-এর মূল অনুপ্রেরণা মো. নূর ইসলাম ৪ এপ্রিল বিকেলে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছেন তার জীবনের সেই রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতার কথা। রেদওয়ান রনি পরিচালিত এবং আফরান নিশো অভিনীত এই সিনেমাটি ২০০৮ সালে আফগানিস্তানে তালেবানদের হাতে অপহৃত নূর ইসলামের অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। ‘দম’ সিনেমাটি দেখে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মো. নূর ইসলাম, তার স্ত্রী আনোয়ারা পারভীন। নূর ইসলাম সিনেমাটিকে আন্তর্জাতিক মানের বলে উল্লেখ করেন একই সঙ্গে তিনি আফরান নিশোর অভিনয়কে ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ বলে অবিহিত করেন। সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন তার অপহরণ সময়ের কিছু পরিস্থিতি ও অনুভূতির কথা।

নূর ইসলাম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নির্মাতা রেদওয়ান রনি এবং প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিলের প্রতি, যাদের কারণে ১৮ বছর পর তার জীবনের এই জয়ের গল্প সাধারণ মানুষের সামনে এসেছে। তিনি জানান, ভূ–রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কিছু বিষয়ের ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে তাকে অপহরণ করা হয় এবং এক পর্যায়ে নেয়া হয় হত্যার সিদ্ধান্ত। 

নূর ইসলাম জানান, তাকে হত্যার জন্য গাধার পিঠে বসিয়ে দেওয়া হয়। তিনি ঠিকমতো পানিও খেতে পারছিলেন না। গাধা হাঁটতে শুরু করলে, স্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী ‘দোয়া ইউনূস’ পড়া শুরু করেন। নূর ইসলাম বলেন, ‘ওরা আমাকে জবাই করার জন্য প্রস্তুত ছিল। আমি খুব জোরে জোরে দোয়া ইউনূস পড়ছিলাম। হঠাৎ অনুভব করলাম আমার সারা শরীর গরম হয়ে গেছে, এক ঐশ্বরিক শক্তি অনুভব করলাম। চার ঘণ্টা ধরে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে শেষে কমান্ডারের নির্দেশে ওরা আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল এবং বলল— ‘তোর ওপর আল্লাহর রহমত আছে, তোকে আর মারা যাবে না।’
নূর ইসলাম ১৮ বছর পর কৃতজ্ঞতা জানান সে সময়ের আপামর জনসাধারণ, টিভি ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি। তিনি বিশ্বাস করেন সকল ধর্মের মানুষের দোয়া এবং মহান আল্লাহর অশেষ রহমতেই তিনি আজ বেঁচে আছেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে নূর ইসলাম বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই ৮৪ দিনের ঘটনা দুই ঘণ্টা আট মিনিটের সিনেমায় পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে আমি চাই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ জানুক— মানুষের দোয়ায় বরকত আছে। আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, আপনার ভেতরে যতক্ষণ পর্যন্ত নিঃশ্বাস আছে, দম আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত হার মানা যাবে না।’ 

৪ এপ্রিল বিকেলে রাজধানীর স্টার সিনেপ্লেক্সে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নূর ইসলামের স্ত্রী আনোয়ারা পারভীন (রানি)। তার স্বামী বেঁচে আছেন এটা বিশ্বাস করা এবং বাংলাদেশে স্বামীকে ফিরিয়ে আনার লড়াইটা করেছেন তিনি। ঘুরেছেন সংবাদমাধ্যম এবং সরকারী অফিসে অফিসে। সবাই একসময় হাল ছেড়ে দিলেও হাল ছাড়েননি আনোয়ারা পারভীন। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হতো সে বেঁচে আছে। আমার বিশ্বাস ছিল সে যদি মারা যায়, আমি টের পাব। অনেকেই মনে করত আমি পাগল হয়ে গেছি, বেশি বেশি করছি, কিন্তু আমার কেমন লাগত সেটা আম বোঝাতে পারব না। সবাই তো ধরেই নিয়েছিল সে আর ফিরবে না। কিন্তু সাংবাদিকরা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। তিনি যে বেঁচে আছেন, সেটা আরও দৃঢ় হয় সাংবাদিকদের দেয়া তথ্যে। ওই সময় আমি কত বিভিন্ন অফিসে গিয়েছি, তারা বিরক্ত হয়েছেন, কিন্তু আমার আর কিছু করার ছিল না।’
বড় পর্দায় মো. নূর ইসলামের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো, সিনেমায় যার নাম থাকে শাহজাহান ইসলাম নূর এবং পূজা চেরী অভিনয় করেছেন রানি চরিত্রে।     
আফরান নিশো অত্যন্ত আবেগপ্রবণভাবে তার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। অভিনেতা বলেন, ‘নূর ভাই এবং তার স্ত্রীকে এখন হয়তো আপনারা ভালোই দেখছেন কিন্তু তাদের ভেতরে এখনও সেইসব দিনের কথা স্পষ্ট। আমি বা আমরা যখন তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, সময় কাটিয়েছি, তখন সেই ক্ষোভ সেই হাহাকারটা দেখেছি। ১৮ বছর আগের ঘটে যাওয়া সেই ঘটনাগুলো এখনো তাদের হুবহু মনে আছে কারণ সেগুলো এখনও জীবন্ত। সিনেমার পর্দায় সবটুকু যন্ত্রণার চিত্রায়ণ করা সম্ভব নয় কারণ সেই অভিজ্ঞতার তীব্রতা দর্শকদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তাই আমরা একটা সর্বজনীন জায়গা থেকে কাজটা করেছি।
মো. নূর ইসলাম ও আনোয়ারা পারভীন যখন কথা বলছিলেন, তখন অনেকবারই ছোখ ছলছল করে উঠেছে পূজার, গলা ধরে এসেছে। সেই অনুভূতিগুলো কাটিয়ে পূজা বলেন, ‘উনারা বাস্তব জীবনের নায়ক–নায়িকা। আমার চরিত্রের অনুপ্রেরণা আমি উনাদের কাছ থেকেই নিয়েছি।’
২০২৩ সালে মো. নূর ইসলামের গল্পটি পড়েন নির্মাতা রেদওয়ান রনি। সেসময় তিনি সিনেমা নির্মাণের জন্য অন্য একটি গল্প নিয়ে আগাচ্ছিলেন, কিন্তু এই ঘটনাটি তাকে এতটাই বিচলিত করে যে, এই গল্পটি নিয়েই তিনি নির্মাণ করে ফেলেন তার নতুন সিনেমা। সংবাদ সম্মেলনে রেদওয়ান রনি বলেন, ‘গল্পটি যখন প্রথম পড়েছি, তখ কেঁদেছি, যখন প্রথম নূর ভাইয়ের সঙ্গে গল্প শোনার জন্য বসেছি তখন দুজন একসঙ্গে কেঁদেছি। নূর ভাই আমাকে তার ডায়রিটা দিয়েছিলেন, সেটা পড়লে বোঝা যায় কেন এটা দমের গল্প, কেন এটা বাংলাদেশের বা বাংলাদেশির জিতে যাওয়ার গল্প। সেটাই আমরা পর্দায় তুলে আনার চেষ্টা করেছি। আমার একটা টেনশন ছিল নূর ভাই সিনেমাটি দেখে কী বলবেন। সিনেমার দেখে এসে তিনি যখন আমাদের জড়িয়ে ধরেছেন তখন আমি চিন্তামুক্ত হয়েছি।’

‘দম’ সিনেমা প্রযোজনা করেছে এসভিএফ আলফা–আই এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেড এবং চরকি। এসভিএফ আলফা–আই এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার শাকিল দর্শকদের এবং সিনেমা সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। এমন অদম্য সাহসিকতার একটি গল্প, বাংলাদেশের গল্প যেন সবাই দেখতে পারে সেজন্য সারাদেশেই সিনেমাট পরিবেশিত হবে বলে নিশি্চত করেন তিনি। বলেন, ‘২৪ এপ্রিল থেকে সিঙ্গেল স্ক্রিনেও মুক্তি পাবে ‘‘দম।”

নির্মাতা রেদওয়ান রনির সঙ্গে ‘দম’ সিনেমার চিত্রনাট্য করেছেন সৈয়দ আহমেদ শাওকী, আল-আমিন হাসান নির্ঝর, মো. সাইফুল্লাহ রিয়াদ, রবিউল আলম রবি।