বিনোদন ডেস্ক
১৮ মার্চ ২০২৬, ১২:৩০ পিএম
এক সময়ের মঞ্চ ও টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেতা শামস সুমনের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিনোদন অঙ্গনে। তাঁর মৃত্যুতে এক আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন শাহরিয়ার নাজিম জয়। পোস্টে জয় জানিয়েছেন, দেশপ্রেম আর শেকড়ের টানে বিদেশের জৌলুস ত্যাগ করে দেশেই থেকেছেন অভিনেতা সুমন। বিনিময় তাঁকে বরণ করতে হয়েছে অসহনিয় মানসিক আর আর্থিক সংকটের চাপ।
ঢাকা মেইলের পাঠকদের জন্য শাহরিয়ার নাজিম জয়ের পোস্টটি হুবহু তুলে দেওয়া হলো-
জানিনা মরে গেলে মৃত মানুষের সাথে দেখা হয় কি না? নাকি অপেক্ষা করতে হয় আখেরাতের ময়দানের জন্য। সেটাও যদি হয়, তাও তো অন্তত আরও ১০০ হাজার বছর, এর চেয়ে কমে না। যতটুকু জানি সেখানেও কেউ কাউকে চিনতে পারবে না। সবাই ছুটোছুটি করতে থাকবে যার যার আমল নিয়ে। তারপর নির্ধারিত হবে কারও জন্য বেহেশত, কারও জন্য দোযখ। তাহলে সুমন ভাই, তোমার সাথে তিন মিনিট দাঁড়িয়ে একটু সুখ-দুঃখের কথা বলার সুযোগ কি আর হবে? নাকি এই যে সেদিন তিন দিন আগে কিংবা এর আগের প্রতিদিন বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, বসে বসে যে কথাগুলো বলেছিলাম, সে কথাগুলোই ইহকাল এবং পরকালের জন্য তোমার-আমার শেষ কথা ছিল?
তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম শাহবাগে পিজি হাসপাতালের সামনে। মহিলা সমিতিতে তোমার মঞ্চনাটকের বলিষ্ঠ অভিনয় ও শুদ্ধ কণ্ঠস্বর আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই সময় আমি নাট্যজনে সাধারণ নাট্যকর্মী হিসেবে ছিলাম। একটা জনপ্রিয় মঞ্চনাটকে নাট্যজন তোমাকে টাকার বিনিময়ে চরিত্রের রূপায়ণের জন্য ডাকতেন; কারণ ওই চরিত্রে তুমি ছিলে অপরিহার্য। আমি ভাবতাম সকলে টাকা খরচ করে অভিনয় করে, অথচ তোমাকে টাকা দিয়ে অভিনয় করায়; কত বড় অভিনেতা তুমি! তারপর ধীরে ধীরে তোমার সাথে নাটকের অভিনয়ে দেখা হয়, বন্ধুত্ব হয়। বয়সে ছোট হলেও তুমি বন্ধুত্ব করে নাও আমার সাথে।
তারপর আমরা একবার ইন্দোনেশিয়া যাই, ফ্লোরিং করে একসাথে দুজন ঘুমাই। একটা বিশেষ কারণে দুজন দুপাশ থেকে মুখ ঘুরিয়ে একসাথে হেসে দিই, কারণ দুজনের মনেই একটা বিষয় কাজ করছিল—সেই বিষয়টা না হয় নাই বললাম। শুধু তুমি আর আমি তা জানি। বিশাল বড় স্ক্রিপ্ট এবং ক্যারেক্টার বিপুল রায়হানকে প্লেনের ভেতরে কনভিন্স করে ছোট করে ফেলি তুমি এবং আমি; কারণ বিদেশে অভিনয়ে যেন আমাদের প্রেশার না পড়ে, আমরা যেন অল্প কাজ করে বেশি আনন্দ করতে পারি।
তারপর ঢাকায় টেলিভিশন নাটকে যেখানে তুমি সেখানে আমি। এত এত নাটক একসাথে করেছি, প্রায়ই তুমি বলতে—আমরা একজন মরলে আরেকজনকে দেখা যাবে। কারণ সব কাজই একসাথে সেই ২০০০ সাল থেকে ২০০৪-০৫ পর্যন্ত। শেষের দিকে তোমার সাথে যখন কথা হতো আমি তোমার কাছ থেকে শুধু হতাশার কথা শুনতাম। আমি তোমাকে সাহস দেওয়ার এবং সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম এবং বোঝাতে চেষ্টা করতাম—তুমি জীবনটাকে এত হালকাভাবে নিচ্ছ কেন? তুমি সিরিয়াস হচ্ছ না কেন? তুমি কাজের প্রতি আরও বেশি ডেডিকেটেড হচ্ছ না কেন? আমার এই 'কেন'র উত্তর তুমি শুধু হাসি দিয়েই উড়িয়ে দিতে।
তারপর তোমার ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের গল্প। আমাকে সব খুলে বলেছিলে। আমি বুঝতে পারছিলাম না কেন তুমি টানাপোড়েন থেকে বের হতে পারছ না। তুমি আমাকে বলেছ তুমি চেষ্টা করছ কিন্তু পারছ না। কিন্তু না পারতে পারতে মানসিক চাপ নিতে নিতে তুমি যে চোখের সামনে এভাবে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে, আমি অনুমান করলেও এটা নিয়ে কখনো গভীরভাবে ভাবিনি। তোমার জীবন থেকে যা শিখলাম—পৃথিবীতে তুমি যত কাজই করো না কেন, যত সম্মানই অর্জন করো না কেন, তোমার যা টাকা লাগবে তা যদি তোমার কাছে না থাকে, তাহলে তুমি সত্যিই মানসিক চাপে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে। আমি জানি তোমার বেলায় তাই হয়েছে।
বাচ্চাদের জন্য তোমার অনেক চিন্তা ছিল। তাদের ভবিষ্যতের জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তুমি তা জোগাড় করতে পারছিলে না। তোমার ফ্যামিলি লন্ডনে থাকে, তারা চেয়েছিল তুমি লন্ডন চলে যাও। কিন্তু তুমি দেশ ছেড়ে যাবে না—এই নিয়ে ছিল এক বিশাল দ্বন্দ্ব। সবাই চলে গেল, তুমি একা রয়ে গেলে রেডিও ভূমিতে এবং মাতৃভূমিতে। তোমার বয়সে পুরুষ একা থাকতে পারে না। থাকবেই বা কেন? একা থাকার জন্য তো সে জীবনের শুরুতে সংসার শুরু করেনি। একা থাকার জন্য সে সমস্ত রোজগার সংসারের জন্য ব্যয় করেনি। সবাই সবার ভবিষ্যতের জন্য, উন্নত জীবনের জন্য যার যার গন্তব্যে চলে গেছে; আর তুমি তাদের সবকিছু দিয়ে একা একা সেক্রিফাইস করেছ।
খাবারের অসুবিধা, লোকের অসুবিধা, টাকার অসুবিধা—এত অসুবিধা নিয়ে ৬০ বছর বয়সে বেঁচে থাকা কি সম্ভব? না সুমন ভাই, সম্ভব না। কারও কোনো দোষ নেই—ভাবিরও নেই, বাচ্চাদেরও নেই, তোমারও নেই। দোষ তোমার ভাগ্যের, দোষ তোমার দেশপ্রেমের। লন্ডন চলে গেলে তুমি তো অনেক উন্নত জীবন পেতে, কিন্তু যাওনি। এখানে, এই মাটিতে, এই বাতাসে তুমি থাকতে চেয়েছ। এখানেই থাকলে, এখানেই মরলে। মাতৃভূমি, রেডিও ভূমি, এরপর মাটির ভূমি—সেখানেই তুমি ঘুমাও ভাই। তোমার আর কোনো দায়িত্ব নেই। আর আসতে হবে না চ্যানেল আই-তে। আর ফিরতে হবে না ঘরে। আর কোনো টেনশন করতে হবে না, টাকার কথা ভাবতে হবে না।
তোমার জীবন থেকে আমি শিখলাম—জীবন ছোট, এক মুহূর্ত নষ্ট করা যাবে না। এক মুহূর্ত নিজেকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। জীবনের প্রয়োজনে যে টাকা, সেই টাকার জোগাড় অবশ্যই করে রাখতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। তোমার মতো সকলের প্রিয় আমি হতে পারব না, সেই সামর্থ্য আমার নেই; কিন্তু তোমার মতো নিজেকে কষ্ট আমি দেব না। বুঝে গেছি ভাই, তুমি বুঝিয়ে গেছ নিজেকে কষ্ট দেওয়া ঠিক না।
সুমন ভাই, তোমার দেওয়া ডায়েরিটা এখনো আমার গাড়িতে। সপ্তাহখানেক আগে উপহার দিয়েছিলে। আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারলাম না। আমার ২৮ বছরের ক্যারিয়ার জীবনে তুমি আমার অমর সঙ্গী। বাকি জীবন ছায়া হয়ে পাশে থেকো। অন্ধকারে কিংবা আলোতে যখন নিজের সাথে নিজে কথা বলি, তখন তোমায় ডাকব, তুমি এসে কথা বলে যেও। ভাই, আমার চ্যানেল আই-তে বাইরে হাঁটতে খুব কষ্ট হবে; প্রতিটি হাঁটার সাথে তুমি জড়িয়ে ছিলে। তোমার রুমে যেতে খুব কষ্ট হবে, হয়তো যাবই না আর কখনো।
তবে সুমন ভাই, তোমার মৃত্যুর পর কিন্তু তুমি অনেক সম্মান পেয়েছ। ফেসবুক খোলা যাচ্ছে না শুধু তোমার সংবাদে। তুমি বলতে তুমি খুবই এভারেজ; কিন্তু কই সুমন ভাই, আমার তো মনে হচ্ছে একজন সুপারস্টারের মৃত্যু হয়েছে। তুমি একজন হিডেন সুপারস্টার। তুমি বেঁচে থাকতে আমি তা বুঝিনি। হে সুপারস্টার, মহান আল্লাহ তোমার আত্মাকে শান্তিতে রাখুন। ঘুমিয়ে থাকো ভাই, আরামে, নিশ্চিন্তে।
ইএইচ/